মধ্যপ্রাচ্য আবারও অগ্নিগর্ভ। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পারমাণবিক কর্মসূচি, প্রক্সি যুদ্ধ, ড্রোন হামলা এবং সামরিক মহড়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
গত কয়েক বছরে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বারবার। ইজ়রায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তেহরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও জ্বালানি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এই সমীকরণকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর মোতায়েন, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা, এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ—সবই যুদ্ধের আবহ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়, তবে তা শুধু তিন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতি পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে।
ইরান–ইজ়রায়েল শত্রুতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইরান ও ইজ়রায়েলের বৈরিতা নতুন নয়—এটি কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ইজ়রায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তেহরান বহুবার প্রকাশ্যে বলেছে, “ইজ়রায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে হবে”—যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগের কারণ।
অন্যদিকে ইজ়রায়েল মনে করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি। তাই তারা গোপন অভিযান, সাইবার হামলা এবং লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার মাধ্যমে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই শত্রুতার আরেকটি বড় দিক হলো প্রক্সি যুদ্ধ। লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী—এসব সংগঠনকে ইরান সমর্থন করে বলে অভিযোগ ইজ়রায়েলের। ফলে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
ফলস্বরূপ, ইরান–ইজ়রায়েল দ্বন্দ্ব এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি একটি বৃহৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে।
আমেরিকার ভূমিকা: সামরিক শক্তির ভারসাম্য

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইজ়রায়েলের অন্যতম প্রধান মিত্র। তাই ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে ওয়াশিংটনের সরাসরি জড়িয়ে পড়া প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর একাধিক যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রয়েছে।
স্ট্রেইট অব হরমুজ—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ—এই অঞ্চলে অবস্থিত। ইরান যদি এই জলপথ অবরুদ্ধ করে, তাহলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। তাই মার্কিন বাহিনী এখানে সর্বদা সতর্ক অবস্থানে থাকে।
গত সময়ে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও রকেট হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এই ‘আঘাত–পাল্টা আঘাত’ পরিস্থিতি ক্রমেই সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন প্রযুক্তিগত ও সামরিক শক্তি ইরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, কিন্তু ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান ও ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা সংঘর্ষকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সম্ভাব্য যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব
যদি ইরান, ইজ়রায়েল ও আমেরিকার মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তার প্রভাব হবে বৈশ্বিক। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব তেলের বড় অংশ সরবরাহ করে, এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যাহত হলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলিতে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, খাদ্য ও শিল্প—সব ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, এই সংঘাত যদি আঞ্চলিক মিত্রদের জড়িয়ে ফেলে, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বৃহৎ সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে—যদিও অধিকাংশ দেশ এখনও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়নি, তবে উত্তেজনা যে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে তা স্পষ্ট। সামরিক প্রস্তুতি, প্রক্সি সংঘর্ষ এবং পারমাণবিক ইস্যু—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে।
বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলি এখনও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে, কারণ একটি বড় যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নয়—বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হবে। আগামী দিনগুলো তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামরিক পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ওপর।






