বিশ্ব বাণিজ্যের রাজনীতিতে শুল্ক কেবল অর্থনৈতিক অস্ত্র নয়—এটি ক্ষমতার প্রতীক। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর আমলে ট্যারিফ ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক লিভার, যার মাধ্যমে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী—দু’পক্ষকেই চাপে রাখা হয়েছে। ভারতও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
২০১৮–২০ সালের সময়কালে ভারতীয় পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক আরোপ, GSP সুবিধা প্রত্যাহার এবং ‘America First’ নীতির জেরে দিল্লি–ওয়াশিংটন সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। প্রকাশ্যে বাক্যবিনিময় কম হলেও, ভিতরে ভিতরে চলছিল তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন।
কিন্তু আজ ছবিটা বদলেছে। সাম্প্রতিক India-US trade deal দেখিয়ে দিয়েছে—শব্দের লড়াইয়ে নয়, বরং নীরব দরকষাকষিতে দিল্লি কীভাবে ধীরে ধীরে ভেঙেছে ট্রাম্পের ট্যারিফ দেওয়াল।
এই সমঝোতা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বহু মাসের কৌশলগত আলোচনা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ফল—যেখানে ভারত নিজের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরতে পেরেছে।
পর্দার আড়ালে দিল্লির কৌশলগত চাপ

ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ধৈর্য। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য কড়া অবস্থানের বিপরীতে দিল্লি কখনও আবেগে প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বরং, ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতি এবং টেকনিক্যাল আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার মূল জায়গাগুলিকে চিহ্নিত করা হয়।
ভারতীয় কর্মকর্তারা বুঝেছিলেন, শুল্ক ইস্যু কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে শিল্প-লবির চাপ। তাই দিল্লি সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে ‘win-win’ কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় মেডিক্যাল ডিভাইস, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম শুল্কের প্রশ্ন। ভারত ধাপে ধাপে শুল্ক পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দেয়, যাতে মার্কিন উৎপাদকদের ক্ষতি কম হয় এবং ভারতীয় রপ্তানিকারকরাও স্বস্তি পান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—এই আলোচনাগুলি প্রকাশ্যে আসেনি। মিডিয়ার বাইরে, নির্দিষ্ট টেবিলে বসে তথ্যভিত্তিক দরকষাকষি চালানোই দিল্লির কৌশলকে কার্যকর করেছে।
ট্রাম্প ট্যারিফ নীতির দুর্বল জায়গা ধরল ভারত

ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতির মূল দর্শন ছিল—আমেরিকার শিল্পকে রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে এই নীতি অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন আমদানিকারক ও ভোক্তাদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল। ভারত এই ফাঁকটাই চিহ্নিত করে।
ভারতীয় আলোচকরা তথ্য দিয়ে বোঝান, ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে মার্কিন ছোট ও মাঝারি ব্যবসার খরচ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যাল কাঁচামাল ও আইটি হার্ডওয়্যারের ক্ষেত্রে ভারত মার্কিন বাজারের জন্য অপরিহার্য।
এই যুক্তি ধীরে ধীরে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন ওঠে—সব দেশকে এক পাল্লায় মাপা কি আদৌ যুক্তিসঙ্গত?
এর পাশাপাশি ভারত কৌশলগতভাবে অন্য ফ্রন্টেও সম্পর্ক মজবুত করে। প্রতিরক্ষা, ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় ভারতের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ফলে বাণিজ্য ইস্যুতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলে বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এই বার্তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নতুন ট্রেড ডিলের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য

এই India-US trade deal কেবল শুল্ক কমানোর চুক্তি নয়—এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশ। কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড়, কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল ট্রেডে সহযোগিতার ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদি লাভের রাস্তা খুলেছে।
ভারতের জন্য এর মানে হল—রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ, বিশেষ করে ফার্মা, টেক্সটাইল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যে। একই সঙ্গে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য ভারতের বাজার আরও পূর্বানুমেয় হয়ে উঠছে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এই চুক্তি বার্তা দিচ্ছে যে, ভারত ও United States সম্পর্ক কেবল সরকারের পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল নয়। ট্রাম্পের কড়া নীতির মধ্যেও দিল্লি দেখিয়ে দিয়েছে—দীর্ঘমেয়াদি কৌশল থাকলে কঠিন দেয়ালও ভাঙা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্য ভারতের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে ভবিষ্যতের বাণিজ্য আলোচনায়—ইইউ, যুক্তরাজ্য বা অন্যান্য বড় অর্থনীতির সঙ্গে।
India-US trade deal প্রমাণ করেছে যে আধুনিক কূটনীতিতে আওয়াজ যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা। ট্রাম্পের ট্যারিফ দেওয়াল ভাঙা হয়েছে প্রকাশ্য সংঘর্ষে নয়, বরং তথ্য, ধৈর্য ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে।
দিল্লির এই পর্দার আড়ালের চাপ ভারতের বৈশ্বিক বাণিজ্য ভাবমূর্তি বদলে দিয়েছে—একটি দেশ, যে জানে কখন কঠোর হতে হয় আর কখন নীরবে এগোতে হয়।






