দুর্গাপুজো মানেই কলকাতার অলিগলি জুড়ে আলোর ঝলকানি, ঢাকের বাদ্যি আর একের পর এক পুজোমণ্ডপে মানুষের ভিড়। কিন্তু যানজট, পার্কিংয়ের সমস্যা কিংবা একসঙ্গে অনেক পুজো দেখার ঝক্কিতে অনেকেরই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সেই সমস্যা কিছুটা সহজ করতে ২০২৬-এর পুজোয় বিশেষ পুজো পরিক্রমার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য পরিবহণ দফতর।
সরকারি বাসের পাশাপাশি এবার পুজো পরিক্রমার তালিকায় থাকছে এসি ট্রাম এবং জলপথের লঞ্চ পরিষেবাও। পরিবহণ দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কলকাতা ও শহরতলির একাধিক ঐতিহ্যবাহী বনেদি বাড়ির পুজো থেকে শুরু করে জনপ্রিয় বারোয়ারি পুজো—এক সফরেই ঘুরে দেখার সুযোগ মিলবে।
১৭ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বিশেষ পরিষেবা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বারাসত, হাওড়া-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকেও পরিষেবা চালানোর কথা জানানো হয়েছে। পুজোর ভিড় সামলাতে প্রায় ৯০-১০০টি নতুন বাস নামানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, এ বছর নিজের গাড়ি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে না থেকে সরকারি পরিবহণেই হতে পারে আপনার পুজো পরিক্রমা। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রবীণ সদস্যদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ঠাকুর দেখার জন্য এই পরিষেবা বিশেষ আকর্ষণের হতে পারে।
বনেদি বাড়ির পুজোয় ঐতিহ্যের স্বাদ

কলকাতার দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ বনেদি বাড়ির পুজো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রীতি, সাবেকি প্রতিমা, পুরনো স্থাপত্য এবং পারিবারিক আচার—সব মিলিয়ে এই পুজোগুলির আবেদন আলাদা।
পরিবহণ দফতরের বিশেষ পরিক্রমায় শোভাবাজার রাজবাড়ি, চাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ি, রানি রাসমণির বাড়ি, বাগবাজারের হালদার পরিবারের পুজো এবং বেহালার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোর মতো একাধিক ঐতিহ্যবাহী ঠিকানা রাখার কথা জানানো হয়েছে।
শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোর সূচনা ১৭৫৭ সালে মহারাজা নবকৃষ্ণ দেবের হাত ধরে। ফলে এই পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, কলকাতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষ বাসে এমন একাধিক বনেদি বাড়ির পুজো ঘুরে দেখার ব্যবস্থা থাকায় দর্শনার্থীদের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের সঙ্গে উৎসবের এক অন্যরকম সংযোগ।
এসি ট্রামে উত্তর থেকে দক্ষিণ, মণ্ডপে মণ্ডপে

এবারের পুজো পরিক্রমায় সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলির একটি হতে পারে এসি ট্রাম পরিষেবা। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রামকে পুজো দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করে বিশেষ রুটে দর্শনার্থীদের বিভিন্ন মণ্ডপে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হাতিবাগান, কাশী বোস লেন, নলিনী সরকার স্ট্রিট, একডালিয়া এবং সিংহী পার্কের মতো পরিচিত পুজো দেখতে বিশেষ ট্রাম পরিষেবা থাকবে। এই পরিক্রমার ভাড়াও জনপ্রতি ৮০০ টাকা বলে জানানো হয়েছে।
ট্রামযাত্রার সঙ্গে কলকাতার পুরনো শহুরে আবহ উপভোগ করার সুযোগও থাকছে। ফলে এটি নিছক মণ্ডপ দর্শনের সফর নয়, বরং শহরের পরিবহণ ঐতিহ্যের সঙ্গে পুজোর আবহকে একসঙ্গে অনুভব করার অভিজ্ঞতা হতে পারে।
গঙ্গাবক্ষে পুজো পরিক্রমা, সঙ্গে এসি বাস
বাস ও ট্রামের পাশাপাশি এবার পুজো পরিক্রমায় থাকছে জলপথের বিশেষ পরিষেবা। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে সকাল ১১টায় মিলেনিয়াম পার্ক থেকে লঞ্চ ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই জলপথের সফরে হাওড়া জেটি ও আহিরীটোলা ঘাট হয়ে উত্তর কলকাতার বিভিন্ন পুজো দেখার সুযোগ থাকবে। আহিরীটোলা থেকে এসি বাসে গিয়ে শোভাবাজার রাজবাড়ি, কুমারটুলি, জগৎ মুখার্জি পার্ক, বাগবাজার-সহ একাধিক পুজো পরিক্রমার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এই প্যাকেজের জনপ্রতি ভাড়া ৮০০ টাকা বলে প্রকাশিত হয়েছে। নদীপথে কলকাতার দৃশ্য উপভোগের পাশাপাশি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখার সুযোগ থাকায় পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে এটি একটি আলাদা অভিজ্ঞতা হতে পারে।
শুধু পুজো দর্শন নয়, বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় গঙ্গাবক্ষে বিশেষ ভেসেলের মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য দেখানোর ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে পরিবহণ দফতর।
কীভাবে বুকিং করবেন?
পুজো পরিক্রমার জন্য বিভিন্ন কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসপ্ল্যানেড ট্রাম ডিপো, কাঁকুড়গাছি S-3B বাস স্ট্যান্ড, যাদবপুর ৮বি বাস টার্মিনাস, গড়িয়া ৬ নম্বর বাস টার্মিনাস, বেহালা ১৪ নম্বর বাস টার্মিনাস, টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো, বারাসত কলোনি মোড় এবং বারাসত তিতুমীর ৯ নম্বর বাসস্ট্যান্ড-সহ একাধিক জায়গায় বুকিংয়ের সুযোগ রয়েছে।
তবে যাত্রার আগে নির্দিষ্ট রুট, সময়, আসন এবং ভাড়া সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়াই ভাল। কারণ পুজোর সময়ে পরিষেবার সময়সূচি বা রুটে পরিবর্তন হতে পারে।
কলকাতার দুর্গাপুজোকে এবার শুধু মণ্ডপের মধ্যে নয়, শহরের বাস, ট্রাম ও জলপথের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও উপভোগ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বনেদি বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য থেকে শুরু করে বারোয়ারি পুজোর উন্মাদনা—পরিকল্পিত পুজো পরিক্রমায় এক সফরেই ধরা দিতে পারে কলকাতার উৎসবের নানা রং।
নিজের গাড়ির ঝক্কি এড়িয়ে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে পুজো দেখার পরিকল্পনা থাকলে সরকারি পরিবহণের এই বিশেষ পরিষেবাগুলি নজরে রাখতে পারেন। বিশেষ করে এসি ট্রাম ও গঙ্গাবক্ষের লঞ্চ পরিষেবা এবারের পুজো ভ্রমণে যোগ করতে পারে আলাদা মাত্রা।






