পবিত্র ঈদুল ফিতরের সকালে কলকাতার রেড রোড আবারও সাক্ষী থাকল ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের এক অনন্য ছবির। হাজার হাজার মুসল্লির সঙ্গে নামাজ আদায়ের পর উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রতিবছরের মতো এবারও রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় রেড রোডে অনুষ্ঠিত হল রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম ঈদের জামাত। ভোর থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে। ঐতিহ্য, আবেগ এবং উৎসব—সব মিলিয়ে সকালটি যেন রূপ নেয় এক বিশাল সামাজিক অনুষ্ঠানে।
মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তাবাহী বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহে এই উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিও নজর কেড়েছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তাঁর উপস্থিতি তৃণমূলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
রেড রোডে হাজারো মুসল্লির ভিড়, প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা

ভোরের আলো ফোটার আগেই রেড রোডে মানুষের সমাগম শুরু হয়ে যায়। সাদা পাঞ্জাবি, টুপি এবং নতুন পোশাকে সজ্জিত মানুষে ভরে ওঠে গোটা এলাকা। শিশু থেকে প্রবীণ—সবাই যেন উৎসবের আনন্দে শামিল হতে এসেছে।
পুলিশ ও প্রশাসনের তরফে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ড্রোন নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে বড় জমায়েত হলেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত।
বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল নামাজের জন্য বিশাল ময়দান, যেখানে সারি সারি করে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। ধর্মীয় নেতারা শান্তি, সহমর্মিতা এবং মানবতার বার্তা তুলে ধরেন খুতবায়।
অনেকের মতে, রেড রোডের এই জামাত শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি কলকাতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
মমতা ও অভিষেকের উপস্থিতি, সম্প্রীতির বার্তা

নামাজ শেষে উপস্থিত মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সকলকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “বাংলা সম্প্রীতির মাটি। এখানে সব ধর্ম, সব ভাষা, সব সংস্কৃতি একসঙ্গে থাকে।”
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুভেচ্ছা জানান। বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন নজর কেড়েছে। অনেকেই সেলফি তোলার জন্য ভিড় করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উপস্থিতি শুধু সৌজন্যমূলক নয়—এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আস্থার বার্তাও বহন করে। নির্বাচনের আগে এই ধরনের জনসংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি ছিল আনন্দ ও উৎসবের। অনেকেই বলছেন, নেতাদের উপস্থিতি উৎসবের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।
ঈদের আনন্দে কলকাতা, ভ্রাতৃত্বের উৎসব

নামাজ শেষে শুরু হয় আসল উৎসব—আলিঙ্গন, শুভেচ্ছা এবং মিষ্টি বিনিময়। “ঈদ মোবারক” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। অনেকেই পরিবারের সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাটে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সেমাই, ফিরনি, কাবাব, বিরিয়ানি—সব মিলিয়ে খাবারের উৎসবও জমে ওঠে।
শিশুদের জন্য দিনটি বিশেষ আনন্দের। নতুন জামা, খেলনা এবং ঘুরতে যাওয়া—সব মিলিয়ে ঈদ যেন তাদের কাছে বছরের সবচেয়ে আনন্দের দিন।
শুধু মুসলিম সম্প্রদায় নয়, বিভিন্ন ধর্মের মানুষও শুভেচ্ছা জানাতে এগিয়ে এসেছেন। এভাবেই ঈদ পরিণত হয়েছে সামাজিক সম্প্রীতির উৎসবে।
রেড রোডের ঈদের নামাজ আবারও প্রমাণ করল—কলকাতা শুধু একটি শহর নয়, এটি সহাবস্থান ও সম্প্রীতির প্রতীক। হাজারো মানুষের প্রার্থনা, নেতাদের উপস্থিতি এবং উৎসবের আনন্দ মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠেছে স্মরণীয়।
ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক ব্যাখ্যা যাই থাকুক, সাধারণ মানুষের কাছে এটি শান্তি ও আনন্দের দিন।
ঈদের এই সকাল তাই শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।






