শহরের আকাশে বিকেল থেকেই ছিল মেঘের ঘনঘটা। ক্রিকেটের নন্দনকানন ইডেন গার্ডেন্সে যখন কলকাতা নাইট রাইডার্স বনাম পাঞ্জাব কিংসের হাই-ভোল্টেজ দ্বৈরথ দেখার জন্য হাজার হাজার সমর্থক ভিড় জমিয়েছিলেন, ঠিক তখনই বাদ সাধল প্রকৃতি। টসের কিছু আগে থেকেই শুরু হয় ঝিরঝিরে বৃষ্টি, যা সময়ের সাথে সাথে রূপ নেয় প্রবল বর্ষণে। শেষ পর্যন্ত মাঠের আম্পায়ার এবং ম্যাচ অফিসিয়ালরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
আইপিএলের পয়েন্ট টেবিলের লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন এই ম্যাচটি দুই দলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে ঘরের মাঠে কেকেআর সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল গ্যালারি কাঁপানো জয়ের। কিন্তু বৃষ্টির দাপটে সেই আশায় জল ঢেলে দিল প্রকৃতি। পিচ কভার দিয়ে ঢেকে রাখা হলেও মাঠের আউটফিল্ড এতটাই ভিজে গিয়েছিল যে খেলা শুরু করাটা ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইডেনের ড্রেনেজ সিস্টেম বিশ্বমানের হওয়া সত্ত্বেও, কয়েক ঘণ্টার একটানা বর্ষণ মাঠকর্মীদের লড়াইকে কঠিন করে তুলেছিল। স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠলেও বাইশ গজে বল গড়াতে দেখা গেল না। দুই দলের অধিনায়ক—শ্রেয়াস আইয়ার এবং শিখর ধাওয়ান যখন একে অপরের সাথে হাত মেলালেন, তখন সমর্থকদের গ্যালারিতে শুধুই নিস্তব্ধতা। আইপিএলের এই মৌসুমে বৃষ্টির কারণে পয়েন্ট ভাগাভাগি হওয়ার ঘটনা দুই শিবিরের অঙ্কই অনেকটা বদলে দিল।
গ্যালারিতে শুধুই হাহাকার: ইডেনের ঐতিহ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াল বৃষ্টি
বৃষ্টির কারণে ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার ফলে কেকেআর এবং পাঞ্জাব কিংস—দুই দলই ১ পয়েন্ট করে ভাগ করে নিল। কিন্তু পয়েন্ট টেবিলের এই ১ পয়েন্টের চেয়েও সমর্থকদের কাছে বড় ক্ষতি হয়ে দাঁড়াল ইডেনের রোমাঞ্চ থেকে বঞ্চিত হওয়া। দুপুর থেকেই মেট্রো স্টেশন থেকে ময়দান চত্বরে যে উন্মাদনা চোখে পড়ছিল, বৃষ্টির তোড়ে তা নিমেষেই ফিকে হয়ে যায়। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিলেন প্রিয় তারকাদের দেখার জন্য, কিন্তু গ্যালারিতে বসে থাকা ভক্তদের কাছে তখন বড় ভরসা ছিল স্মার্টফোনের ওয়েদার অ্যাপ।

ম্যাচ অফিসিয়ালরা বেশ কয়েকবার মাঠ পরিদর্শন করেন। মাঝে একবার বৃষ্টি থামলে মাঠকর্মীরা সুপার সপার নিয়ে মাঠে নামেন। ভিজে আউটফিল্ড শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলে। কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে গ্রাউন্ডসম্যানরা নিজেদের সেরাটা দিলেও আকাশের মতিগতি ছিল অন্যরকম। মাঠের কয়েক জায়গায় জল জমে যাওয়ায় ক্রিকেটারদের ফিল্ডিং করা বা দৌড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
পয়েন্ট টেবিলের জটিল সমীকরণ: কেকেআরের প্লে-অফ যাত্রায় প্রভাব
এই ম্যাচটি পরিত্যক্ত হওয়ার ফলে কলকাতার জন্য প্লে-অফের লড়াই কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ল। ঘরের মাঠে ২ পয়েন্ট পাওয়া ছিল কেকেআরের জন্য বোনাস, কিন্তু ১ পয়েন্ট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হওয়ায় এখন বাকি ম্যাচগুলোতে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে নেট রান রেটের বিচারে এই ১ পয়েন্ট ভবিষ্যতে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। পাঞ্জাব কিংসের জন্যও পরিস্থিতি প্রায় একই। তারাও জয়ের সন্ধানে কলকাতায় এসেছিল, কিন্তু প্রকৃতি তাদের সেই সুযোগ দিল না।

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, ইডেনের মতো মাঠে বৃষ্টির কারণে ম্যাচ বাতিল হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কলকাতা নাইট রাইডার্সের ব্যাটিং লাইনআপ বর্তমানে যে ফর্মে রয়েছে, তাতে পাঞ্জাবের বোলারদের জন্য কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল। অন্যদিকে, পাঞ্জাব কিংসের টপ অর্ডারও ইডেনের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে বড় রান তোলার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু লড়াই শুরুর আগেই সব শেষ। এখন দুই দলকেই তাদের পরবর্তী অ্যাওয়ে ম্যাচের দিকে নজর দিতে হবে।
সমর্থকদের ধৈর্য এবং গ্রাউন্ডসম্যানদের লড়াই
ইডেনে ম্যাচ চলাকালীন বৃষ্টি নতুন কিছু নয়, তবে বৃষ্টির এই তীব্রতা সাধারণত কালবৈশাখীর সময়ে বেশি দেখা যায়। বৃষ্টির মধ্যেও হাজার হাজার সমর্থক গ্যালারিতে বসে ছিলেন এই আশায় যে হয়তো ৫ ওভারের একটি কার্টেল ম্যাচ দেখা যাবে। আম্পায়াররা যখন রাত ৯টা নাগাদ শেষবারের মতো মাঠ পরিদর্শনে নামেন, তখন আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হলেও আউটফিল্ডে কাদার সমস্যা দূর করা সম্ভব হয়নি। মাঠকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দুই দলের অধিনায়কই।

কলকাতা ক্রিকেট প্রেমিদের জন্য এই রাতটি ছিল অত্যন্ত বেদনার। যে উন্মাদনা নিয়ে তারা ‘করব লড়ব জিতব রে’ স্লোগানে গ্যালারি কাঁপানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তা কেবল দীর্ঘশ্বাসে শেষ হল। ক্লাব হাউসের সামনের চত্বরে সমর্থকদের ক্ষোভ আর দুঃখ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তবে আইপিএলের রোমাঞ্চ এখনো বাকি, এবং নাইট রাইডার্স ভক্তরা আশা করছেন পরের ম্যাচেই ইডেন আবার তার পুরনো মেজাজে ফিরবে।
সবশেষে বলা যায়, ইডেন গার্ডেন্সে বৃষ্টির এই দাপট কেবল একটি ক্রিকেট ম্যাচ কেড়ে নিল না, বরং হাজার হাজার মানুষের আবেগকেও থামিয়ে দিল। আইপিএলের দীর্ঘ সূচিতে এমন ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক হলেও, ইডেনের মতো ঐতিহ্যের আঙিনায় এটি সমর্থকদের কাছে বড় ধাক্কা। কেকেআর এখন চাইবে এই ম্যাচ ভুলে সামনের দিকে তাকাতে এবং পাঞ্জাব কিংস তাদের পরবর্তী হোম ম্যাচে নিজেদের গুছিয়ে নিতে সচেষ্ট হবে। ক্রিকেটে প্রকৃতিই শেষ কথা, আর সেই কথা মেনেই ১ পয়েন্ট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হল দুই শিবিরকে।






