ভক্তি, বিস্ময় ও শিল্প—এই তিনের সুনিপুণ জালের মধ্যেই আত্মপ্রকাশ করল সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত আসন্ন চলচ্চিত্র Lawho Gouranger Naam Rey–এর প্রথম গান ‘Dyakho Dyakho Kanaiye’। ইন্দ্রাদীপ দাশগুপ্তের সুর, গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা এবং জয়তী চক্রবর্তীর হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠ—গানটি মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই দর্শককে টেনে নিয়ে যায় চৈতন্যভক্তির আলো-আঁধারি দুনিয়ায়।
গানের যে মুহূর্তটিকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রের কাহিনিতে একটি আবেগতাড়িত দৃশ্য নির্মিত হয়েছে, সেটি বিনোদিনী দাসীর চৈতন্যরূপে মঞ্চে পরিবেশনা। সুবশ্রী গাঙ্গুলির অভিনয়ে ফুটে ওঠা সেই চৈতন্য-ভক্তির তীব্রতা, আত্মসমর্পণ এবং শিল্পীর ভেতরের আধ্যাত্মিক উন্মোচন গানের সুর-লয়ের সঙ্গে গভীরভাবে মিলেমিশে এক অদ্ভুত নিবিড় শক্তি তৈরি করেছে। এই গানের প্রকাশেই চলচ্চিত্র যে তার ভক্তিময়, ঐতিহাসিক ও সঙ্গীতনির্ভর বর্ণনার দরজা খুলে দিল, তা পরিষ্কার।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ মুক্তি পেতে চলা এই চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে SVF Entertainment এবং DCM। চৈতন্য মহাপ্রভুর চরিত্রে দিব্যজ্যোতি দত্ত, সঙ্গে ইশা সাহা, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, জীশু সেনগুপ্ত, অনন্যা ব্যানার্জি, সুশ্মিতা চট্টোপাধ্যায়, অরাত্রিকা মাইতি, ব্রাত্য বসু এবং পার্থ ভৌমিক—এক শক্তিশালী অভিনয়বাহিনী পুরো ছবিটিকে আরও একধাপ সমৃদ্ধ করতে চলেছে।
যে গানটি দিয়ে প্রচারযাত্রার সূচনা, সেটি যে সাধারণ কোনো ধর্মীয় গীতি নয়, বরং ভক্তির ব্যাকরণ, নাট্যশৈলী ও সমাজ-ইতিহাসের এক বহুমাত্রিক প্রতিফলন—তা প্রকাশেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিনোদিনী দাসীর চৈতন্যরূপ: এক আধ্যাত্মিক মগ্নতার শিল্পনৈপুণ্য
গানটির গল্প যে দৃশ্য থেকে উঠে এসেছে, সেটির সাহিত্যিক ও নাট্যশৈলীর গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। উনিশ শতকের বাংলা থিয়েটারের অন্যতম আলোচিত চরিত্র বিনোদিনী দাসী—যিনি নিজের সংগ্রাম, খ্যাতি এবং শিল্পীজীবনের নানা বাঁকে আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ খুঁজে পেয়েছিলেন।
সেই শিল্পীজীবনেরই এক বিস্ময়কর মুহূর্ত—চৈতন্যরূপে তাঁর পরিবেশনা, যা সে সময়ে যেমন দর্শকদের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল, তেমনই আজও ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয়। চলচ্চিত্রে সুবশ্রী গাঙ্গুলির অভিনয় সেই আধ্যাত্মিক মগ্নতার তীব্রতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। চোখের দৃষ্টি, শরীরী অঙ্গভঙ্গি, ভক্তির অঙ্গুলি-ইশারা—সব মিলিয়ে গানটি দর্শককে চৈতন্যভক্তির আবহে ডুবিয়ে দেয়।
গানটির প্রতিটি সুর এমন এক মানসিক অবস্থাকে সামনে আনে, যেখানে ভক্তি শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুভূতি নয়, বরং শিল্পীর ব্যক্তিগত মুক্তি, অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা ও আত্মোপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ।
‘Dyakho Dyakho Kanaiye’—সুরের ভিতরে ভক্তি, নৃত্য ও নাট্যনৈপুণ্য
ইন্দ্রাদীপ দাশগুপ্ত বরাবরই ভক্তিসঙ্গীত ও ন্যারেটিভ-ড্রিভেন সুরসৃষ্টিতে দক্ষ। এই গানেও তাঁর সুরের ভিতরে রয়েছে এক অদ্ভুত ‘তানসঙ্গম’—যেখানে শাস্ত্রীয় ঘরানার সুরভি মিলেছে বাউল-ভাবনার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে। চৈতন্যভক্তির বৈশিষ্ট্যগত আবেগ ‘মাধুর্য’ ও ‘বিলাস’—এ দুটি স্তরকে তিনি আলাদা আলাদাভাবে না দেখিয়ে এক অক্ষুণ্ণ স্রোতের মতো সাজিয়েছেন।
গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা গানটিতে যে নাট্য-প্রবাহ রয়েছে, তা কেবল devotional expression নয়; বরং এক নাট্যভাষার প্রতিফলন। প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি সংলাপ, আর জয়তী চক্রবর্তীর কণ্ঠ সেই সংলাপকে জীবন্ত করে তোলে। তাঁর গায়কীতে যেমন আছে সংযম, তেমন আছে উচ্ছ্বাসের সুনিপুণ সামঞ্জস্য।
গানটি শুনলে বোঝা যায়—এটি সিনেমার একটি সাধারণ গানের মতো নয়; বরং কাহিনির গতি নির্ধারণকারী একটি স্তম্ভ, যা চরিত্রের ভেতরের আলোক-অন্ধকারকে দর্শকের কাছে উন্মোচন করে।
‘Lawho Gouranger Naam Rey’—ঐতিহাসিক ভক্তি, রাজনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি (H2)
সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সিনেমাগুলোর মধ্যে ইতিহাস, সাহিত্য ও মানবমনের দ্বৈততার মেলবন্ধন বরাবরই বিশেষ মনোযোগ কেড়ে এসেছে। এই ছবিতেও তিনি চৈতন্যভক্তি ও নবজাগরণের মধ্যকার নানান সমাজ-রাজনৈতিক স্তরকে একত্রিত করার চেষ্টায় আছেন।
ঐ সময়ে বাঙালি সমাজে ভক্তি আন্দোলন শুধু ধর্মীয় একতা নয়; ছিল সামাজিক ভাঙন, শিল্পের নতুন পরিধি, আর ব্যক্তিসত্তার মুক্তি নিয়ে নানা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেই দিক থেকে Lawho Gouranger Naam Rey কেবল একটি জীবনী-ভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়, বরং একটি সময়-নির্ভর সমাজ-রাজনৈতিক দলিল।
সৃজিতের কাস্টিং নির্বাচনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দিব্যজ্যোতি দত্তের চৈতন্যরূপ অত্যন্ত অনন্য; তাঁর শরীরী ভাষা, গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক উপস্থিতি গল্পকে একটি ভরকেন্দ্র দেয়। অন্যদিকে ইশা সাহা, জীশু, ইন্দ্রনীল প্রমুখ অভিনেতারা যুগের সংস্কৃতি-সংঘাত ও মানবিক বয়ানকে আরও গাঢ় করে তুলছেন।
গানের মুক্তি দিয়ে যে আবেগময় সূচনা হল, তা ছবির বড় দর্শকগোষ্ঠীর মধ্যে আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেবে—এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
গান, নাট্য-রূপ, ভক্তি ও ইতিহাস—এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে Dyakho Dyakho Kanaiye কেবল একটি ফিল্ম সং নয়; এটি সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নির্মিত বিশ্বের প্রথম দরজা। বিনোদিনী দাসীর মঞ্চ-পরিবেশনার ভক্তিগত তীব্রতা, চৈতন্যভক্তির নান্দনিক স্পন্দন, ইন্দ্রাদীপ দাশগুপ্তের ব্যথাভরা সুর এবং জয়তী চক্রবর্তীর অসামান্য কণ্ঠ—সব মিলিয়ে গানটি দর্শক-শ্রোতাকে এমন এক অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায় যা আধুনিক বাংলা সিনেমায় বিরল।
আগামী ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ যখন সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে আসবে, তখন এই এক গানই প্রমাণ হয়ে থাকবে—Lawho Gouranger Naam Rey শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক-ঐতিহাসিক যাত্রার দৃঢ় সূচনা।






