ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেত্রী, প্রযোজক ও উদ্যোক্তা দীপিকা পাড়ুকোন আবারও প্রমাণ করলেন যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিনোদন শিল্পে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল প্রতিভা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তিনি শুরু করেছিলেন ‘Create With Me – OnSet Program’, আর কয়েক মাসের দীর্ঘ আবেদন প্রক্রিয়ার পর অবশেষে সেই উদ্যোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সামনে আনলেন।
সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা এক ভিডিও বার্তায় দীপিকা জানান, গত তিন মাস তাঁর ও তাঁর টিমের জন্য ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। বিপুল সংখ্যক আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করা থেকে শুরু করে সম্ভাবনাময় প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা— পুরো প্রক্রিয়াই ছিল সময়সাপেক্ষ কিন্তু একই সঙ্গে অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।
ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, “It’s been a gruelling 3 months… Stay tuned to find out our first Cohort.” অর্থাৎ খুব শিগগিরই ঘোষণা করা হবে প্রথম ব্যাচের নির্বাচিত অংশগ্রহণকারীদের নাম। এই ঘোষণার অপেক্ষায় এখন বহু তরুণ সৃজনশীল কর্মী ও চলচ্চিত্রপ্রেমী।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই প্রোগ্রামটি শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়— বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পে প্রবেশের একটি বাস্তব সুযোগ। লেখক, পরিচালক, প্রযুক্তিবিদ থেকে শুরু করে মেকআপ শিল্পী— সকলের জন্যই এটি হতে পারে ক্যারিয়ারের বড় মোড়।
অনসেট প্রোগ্রাম: বাস্তব সেটে শেখার বিরল সুযোগ

‘Create With Me – OnSet Program’-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। সাধারণ কর্মশালার মতো শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি পেশাদার চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন সেটে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
প্রোগ্রামটি এমনভাবে পরিকল্পিত যাতে অংশগ্রহণকারীরা বিনোদন শিল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- স্ক্রিপ্ট রাইটিং
- নির্দেশনা
- ক্যামেরা ও সিনেমাটোগ্রাফি
- আলো পরিকল্পনা
- এডিটিং
- সাউন্ড ডিজাইন
- আর্ট ডিরেকশন
- কস্টিউম ডিজাইন
- হেয়ার ও মেক-আপ
- প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট
ভারতের মতো প্রতিযোগিতামূলক চলচ্চিত্র শিল্পে বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রতিষ্ঠা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। সেই কারণে এই উদ্যোগকে অনেকেই ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যারা ফিল্ম স্কুলে পড়েননি কিন্তু শিল্পে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য এটি এক বিরল সুযোগ।
দীপিকা নিজেও বারবার বলেছেন, তিনি চান প্রতিভাবান কিন্তু সুযোগবঞ্চিত তরুণরা যেন শিল্পে প্রবেশের দরজা খুঁজে পায়। এই প্রোগ্রাম সেই লক্ষ্যেই তৈরি।
‘Create With Me’ প্ল্যাটফর্মের বিস্তৃত দৃষ্টি

এই অনসেট প্রোগ্রামটি আসলে দীপিকার বৃহত্তর উদ্যোগ ‘Create With Me’ প্ল্যাটফর্মের অংশ। গত বছর তিনি যখন প্রথম এই প্ল্যাটফর্ম চালু করেন, তখন সারা দেশ থেকে বিপুল সাড়া পান। লেখক, পরিচালক, কনটেন্ট নির্মাতা— অসংখ্য তরুণ তাঁদের ধারণা জমা দেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে ‘Pitch Format’ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন কনসেপ্ট ও গল্পের আইডিয়া আহ্বান করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণভিত্তিক প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে।
দীপিকার মতে, ভারতের গল্প বলার ক্ষমতা অসীম— কিন্তু প্রায়শই নতুন কণ্ঠস্বরের কাছে প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম থাকে না। তাই তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চান যেখানে নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীল মানুষরা শুধু শিখবে না, বরং নিজেদের প্রকল্প তৈরি করার সক্ষমতাও অর্জন করবে।
এছাড়াও, প্রোগ্রামটি সহযোগিতামূলক কাজের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি দলগত শিল্প— এবং বাস্তব সেটে কাজ করার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা সেই সমন্বয় শেখার সুযোগ পাবেন।
আবেদন প্রক্রিয়া: চ্যালেঞ্জিং কিন্তু অনুপ্রেরণামূলক

দীপিকার সাম্প্রতিক ভিডিও বার্তায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আবেদনপত্র বাছাইয়ের কঠিন প্রক্রিয়া। তিনি জানান, প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি মানসম্পন্ন আবেদন এসেছে, যা নির্বাচনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শুধু লিখিত আবেদন নয়, বহু প্রার্থীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথাও বলেছেন তিনি ও তাঁর টিম। এই সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে আবেদনকারীদের আগ্রহ, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে গভীর ধারণা পাওয়া গেছে।
এই অভিজ্ঞতা দীপিকার কাছে অত্যন্ত আবেগঘন ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কারণ অনেক তরুণই তাঁদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা খোলাখুলি ভাগ করে নিয়েছেন।
প্রোগ্রামের প্রথম ব্যাচ বা ‘কোহর্ট’ ঘোষণা খুব শিগগিরই করা হবে— এই খবর ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। নির্বাচিত অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ।
নতুন প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী লঞ্চপ্যাড
চলচ্চিত্র শিল্পে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হল অভিজ্ঞতার অভাব এবং সঠিক সংযোগের অভাব। ‘OnSet Program’ এই দুই সমস্যাকেই সরাসরি সমাধান করার চেষ্টা করছে।
অংশগ্রহণকারীরা শুধু কাজ শেখার সুযোগই পাবেন না, বরং অভিজ্ঞ পেশাদারদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে শিল্পের বাস্তব গতিবিধি বুঝতে পারবেন। ভবিষ্যতে নিজেদের প্রকল্প পরিচালনা করার মতো আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতাও তৈরি হবে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ ভারতীয় বিনোদন শিল্পে ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্টের নতুন ধারা তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন প্রোগ্রাম বহুদিন ধরেই রয়েছে, কিন্তু ভারতে তা তুলনামূলকভাবে কম।
দীপিকার এই উদ্যোগ তাই শুধু ব্যক্তিগত প্রকল্প নয়— বরং শিল্পের সামগ্রিক বিকাশের দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
‘Create With Me – OnSet Program’ প্রমাণ করে যে দীপিকা পাড়ুকোন শুধুমাত্র একজন সফল অভিনেত্রী নন, তিনি ভবিষ্যতের সৃষ্টিশীল শিল্প নির্মাণেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চান। তিন মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর তাঁর দেওয়া এই আপডেট নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
প্রথম ব্যাচের নাম ঘোষণার পরই বোঝা যাবে এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এতেই স্পষ্ট— নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা এখন তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ভারতীয় বিনোদন শিল্পে নতুন কণ্ঠস্বরের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।






