রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বৃহস্পতিবার ব্যাপক বিক্ষোভে নামল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করার অভিযোগ তুলে জেলা থেকে ব্লক—সব স্তরেই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে গেরুয়া শিবির।
বিজেপির দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে রাজ্য সরকার প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তালিকা বদলের চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগেই সরব হয়েছেন বিরোধী নেতারা।
শহর কলকাতা থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় একযোগে মিছিল, অবস্থান-বিক্ষোভ এবং স্মারকলিপি জমা দেওয়ার কর্মসূচি পালিত হয়। বহু জায়গায় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনাও সামনে এসেছে।
এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজ্য রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠছে—ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বিজেপির অভিযোগ ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের বক্তব্য, Special Intensive Revision প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকা আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করা। কিন্তু বাস্তবে তা রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক হাতিয়ারে। অভিযোগ করা হচ্ছে, বহু এলাকায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, আবার নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য তালিকায় অনিয়ম করা হচ্ছে।
দলের নেতাদের দাবি, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা এবং বিরোধী সমর্থনপ্রবণ অঞ্চলে SIR প্রক্রিয়া বেশি প্রভাবিত হয়েছে। বিজেপির মতে, এটি আসন্ন লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক জমি শক্ত করার কৌশল।
বিক্ষোভ মঞ্চ থেকে একাধিক বিজেপি নেতা বলেন, “ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে গণতন্ত্রকে দুর্বল করা। আমরা এই চক্রান্ত মেনে নেব না।” তাঁদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশকে উপেক্ষা করে রাজ্য প্রশাসন নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
এই ইস্যুতে বিজেপি স্পষ্ট করেছে, প্রয়োজনে তারা আইনি পথেও যাবে এবং নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, SIR বিতর্ক এখন রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছে।
রাজ্য সরকারের পাল্টা যুক্তি ও প্রশাসনিক অবস্থান

বিজেপির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে রাজ্য সরকার জানিয়েছে, SIR প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত ও আইনি প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত নয়।
শাসক দলের নেতাদের বক্তব্য, প্রকৃত ভোটারদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। ভুল তথ্য, দ্বৈত নাম নথিভুক্তি এবং মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কাজ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপি আসলে রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতেই প্রশাসনিক কাজকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। তাঁদের মতে, নির্বাচনের আগে উত্তেজনা সৃষ্টি করাই বিজেপির মূল লক্ষ্য।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, প্রতিটি সংশোধনের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট নথি ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনও ভোটার যদি মনে করেন তাঁর নাম অন্যায়ভাবে বাদ পড়েছে, তবে আপিলের সুযোগও রয়েছে।
রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভের চিত্র ও জনমতের প্রতিক্রিয়া
বিক্ষোভের দিন রাজ্যের একাধিক জেলায় রাজনৈতিক উত্তেজনার ছবি সামনে আসে। কোথাও রাস্তা অবরোধ, কোথাও জেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান—সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে সরব ছিল বিজেপি।
কিছু এলাকায় পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা এবং আটক হওয়ার ঘটনাও ঘটে। যদিও বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। কেউ মনে করছেন ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি, আবার অনেকেই এই বিক্ষোভকে নির্বাচনী রাজনীতির অঙ্গ বলেই দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, SIR বিতর্ক শুধু প্রশাসনিক ইস্যু নয়—এটি আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র করতে পারে। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন সাধারণ মানুষের কাছে যত বেশি পৌঁছবে, ততই এই ইস্যু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বিজেপির অভিযোগ এবং তার জেরে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। একদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারের পাল্টা ব্যাখ্যা—এই দ্বন্দ্বের মাঝেই সাধারণ ভোটারের আস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসন্ন নির্বাচন যত এগোবে, ততই এই ইস্যু রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ভোটার তালিকা সংশোধন আদৌ কতটা নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করবে এই বিতর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ।






