বঙ্গোপসাগরের ওপর তৈরি হওয়া নিম্নচাপ দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এই সিস্টেমটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দেশের পূর্ব উপকূলজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, একইসঙ্গে কলকাতার তাপমাত্রা নেমে এল মরসুমের সর্বনিম্ন স্তরে। সোমবার ভোরে শহরের পারদ ছুঁয়ে ফেলল ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি শীতের প্রথম বড় পতন। ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করতেই নাগরিকদের মধ্যে শীতের অনুভব প্রকট হয়ে উঠেছে।
উত্তর ভারত থেকে নেমে আসা শুষ্ক ঠান্ডা হাওয়া ও বঙ্গোপসাগরে ঘনীভূত নিম্নচাপ—এই দুইয়ের মিলনে পূর্ব ভারতের আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী কয়েক দিনে আবহাওয়ার আচরণ আরও পরিবর্তনশীল হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে তার গতিপথ, বেগ এবং উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই বৈঠক শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন। দুর্যোগ মোকাবিলা দলগুলিকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ জারি হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস: কোন পথে এগোতে পারে নিম্নচাপ

বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে তৈরি হওয়া এই নিম্নচাপ ইতিমধ্যেই গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, সমুদ্রের উষ্ণতা এবং অনুকূল বায়ুপ্রবাহ এ সিস্টেমটিকে আরও শক্তিশালী হতে সাহায্য করছে। সাধারণত ওই অঞ্চলে জলীয় বাষ্পের ঘনত্ব বেশি থাকলে ঘূর্ণিঝড় তৈরির সম্ভাবনা বাড়ে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
তথ্য অনুযায়ী, নিম্নচাপটি প্রথমে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হবে। এরপর শক্তি বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। এর সম্ভাব্য নামও ঠিক হয়ে গেছে—যদি এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়, তবে আঞ্চলিক আবহাওয়া সংস্থার তালিকা অনুযায়ী সেটির নাম হতে পারে ‘মিদালি’।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলেও তার পথ শেষ মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। কারণ, শীতকালীন বায়ুপ্রবাহ অনেক সময় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথে প্রভাব ফেলে। আপাতত আন্দামান–নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে সিস্টেমটি শক্তি সঞ্চয় করছে। উপকণ্ঠে ৫০–৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে বলে পূর্বাভাস।
উপকূলবর্তী ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য ইতিমধ্যেই প্রাথমিক সতর্কতা জারি হয়েছে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় বড় নৌযান ছাড়া বাকিদের সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে।
কলকাতায় মরসুমের প্রথম ১৬ ডিগ্রি: কোন হাওয়ার প্রভাবে পড়ল শীতের ছোঁয়া

কলকাতায় তাপমাত্রা হঠাৎ নেমে যাওয়ার মূল কারণ উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বইতে থাকা শুষ্ক ঠান্ডা হাওয়া। দিল্লি, পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা অঞ্চলে তাপমাত্রা বহুদিন ধরেই কমছিল। সেই ঠান্ডা হাওয়া এবার পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেছে।
রবিবার রাত থেকে ঠান্ডার গা ছমছমে অনুভূতি বাড়তে শুরু করে। সোমবার ভোরে আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানায়, শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১৬.০ ডিগ্রি, যা স্বাভাবিকের প্রায় ৩ ডিগ্রি কম। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তাপমাত্রা এমনভাবে নেমে আসা তুলনামূলকভাবে বিরল ঘটনা।

এই হঠাৎ তাপমাত্রা পতনকে অনেকেই “প্রি-উইন্টার স্পেল” হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ মূল শীত এখনো পুরোপুরি নামেনি, তবে তার আগমনী সুর শুরু হয়ে গেছে। কেননা ঘূর্ণিঝড় তৈরির মতো সিস্টেম তৈরি হলে অনেক সময় পূর্ব ভারতের আকাশে মেঘলা ভাব বেড়ে যায়, ফলে আবার তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তেও পারে।
আবহাওয়াবিদদের ধারণা, আগামী ২–৩ দিনে কলকাতার তাপমাত্রা সামান্য ওঠানামা করবে। তবে ঠান্ডার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
উপকূলবর্তী জেলাগুলোর প্রস্তুতি: প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষের সতর্কতা

ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা মাথায় রেখে উপকূলবর্তী প্রতিটি জেলায় প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উপকূলজেলাগুলি—পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং উত্তর ২৪ পরগনায় সজাগ রয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা দল।
দীঘা, মন্দারমণি ও শঙ্করপুরের মতো পর্যটন এলাকায় সমুদ্রে নেমে পর্যটকদের নিষেধ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই লাইফগার্ড দল এবং পুলিশ টহল বাড়ানো হয়েছে। সমুদ্রের হাওয়া সাধারণের মন ভালো করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে প্রশাসনের বার্তা।
মৎস্যজীবীদের বলা হয়েছে, সমুদ্রে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে। যারা ইতিমধ্যেই গভীর সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। উপকূলের আশপাশে বড় জাহাজও নিরাপদ স্থানে নোঙর করতে বলা হচ্ছে।

ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশ প্রশাসনও উপকূলবর্তী গ্রামগুলোতে মাইকে প্রচার শুরু করেছে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সাইক্লোন শেল্টারে মানুষদের স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগও হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চিকিৎসা কর্মী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে।
সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির জন্য কৃষকরাও উদ্বেগে। কারণ, এই সময়ে ধান কাটা শেষ না হলে ঘূর্ণিঝড় বা তার প্রভাবে বৃষ্টিতে চাষের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। সেইজন্য কৃষি দপ্তর দ্রুত ফসল তোলার পরামর্শ দিয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ আগামী দুই দিনের মধ্যেই ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে—এই পূর্বাভাস পূর্ব ভারতের আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একইসঙ্গে কলকাতায় মরসুমের প্রথম উল্লেখযোগ্য ঠান্ডা পড়ায় শহরবাসীর শীত-উত্তেজনা বাড়লেও প্রকৃতির এই দ্বিমুখী আচরণ বিশেষজ্ঞদের আরও সতর্ক করে তুলছে।
আগামী ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে তার পথ, শক্তি এবং প্রভাব—সব কিছুই শেষ মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। তাই আবহাওয়ার আপডেট জানার পাশাপাশি উপকূলবর্তী এলাকার মানুষদের সতর্ক ও প্রস্তুত থাকা ছাড়া উপায় নেই।






