পশ্চিমবঙ্গের বেলডাঙা সংক্রান্ত একটি মামলায় তদন্তের অধিকার নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেল। রাজ্যের দাবি, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার ঘটনায় কেন্দ্রীয় সংস্থা হস্তক্ষেপ করে সংবিধানিক কাঠামো লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সেই যুক্তিতেই রাজ্য সরকার এবার সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
রাজ্যের অভিযোগ, বেলডাঙার ঘটনায় রাজ্য পুলিশের তদন্ত চলাকালীন এনআইএ হস্তক্ষেপ করে কার্যত সমান্তরাল তদন্ত শুরু করেছে। এতে শুধু প্রশাসনিক বিভ্রান্তিই নয়, ফেডারেল কাঠামোর ওপরও প্রশ্ন উঠছে। রাজ্যের মতে, আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয় মূলত রাজ্যের অধিকারভুক্ত।
কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকা ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম বিতর্ক নয়। এর আগেও একাধিক মামলায় রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সংঘাত প্রকাশ্যে এসেছে। তবে বেলডাঙা ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—এনআইএ কি তার আইনি সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করছে, নাকি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই কেন্দ্রীয় তদন্ত অপরিহার্য? এই দ্বন্দ্বের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দিকে।
বেলডাঙা তদন্ত ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত

মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় প্রথমে রাজ্য পুলিশ তদন্ত শুরু করে। রাজ্যের বক্তব্য, এটি একটি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনা, যেখানে রাজ্য পুলিশের যথেষ্ট ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অনুমোদনে National Investigation Agency (এনআইএ) তদন্তে নামে।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত। রাজ্য সরকারের অভিযোগ, এনআইএ-র হস্তক্ষেপে স্থানীয় তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে এবং রাজ্যের প্রশাসনিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে কোনও নির্দিষ্ট সন্ত্রাসবাদী যোগসূত্র বা আন্তঃরাজ্য নেটওয়ার্কের প্রমাণ সামনে না আসা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সংস্থার প্রবেশ প্রশ্ন তুলেছে।
রাজ্য প্রশাসনের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় সংস্থা যুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ে এবং ঘটনাকে অযথা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ তকমা দেওয়া হয়। অন্যদিকে কেন্দ্রের দাবি, প্রাথমিক কিছু তথ্যের ভিত্তিতেই এনআইএ তদন্ত জরুরি বলে মনে হয়েছে।
এই দ্বৈত অবস্থানই বেলডাঙা তদন্তকে সাধারণ অপরাধের গণ্ডি ছাপিয়ে সাংবিধানিক বিতর্কে পরিণত করেছে।
সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের আবেদন: আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন (H2)
এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার সরাসরি Supreme Court of India-এ মামলা দায়ের করেছে। আবেদনে রাজ্যের যুক্তি, এনআইএ আইনের ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে, যা এই ঘটনায় পূরণ হয়নি।
রাজ্যের আইনজীবীরা আদালতে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয়—এটি সংবিধানের সপ্তম তফসিলেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, কেন্দ্রীয় সংস্থা বারবার রাজ্যের অনুমতি ছাড়াই তদন্ত শুরু করলে ফেডারেল কাঠামো দুর্বল হবে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, যদি প্রতিটি বড় অপরাধেই এনআইএ হস্তক্ষেপ করে, তবে রাজ্য পুলিশের ভূমিকা কার্যত সীমিত হয়ে যাবে। রাজ্যের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও।
অন্যদিকে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি আসতে পারে—জাতীয় নিরাপত্তার সম্ভাব্য দিক থাকলে কেন্দ্রীয় তদন্ত আইনসম্মত। ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায় শুধু বেলডাঙা নয়, ভবিষ্যতে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বেলডাঙা ইস্যু শুধুমাত্র আইনি লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও। রাজ্যের শাসক দল দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee আগেও একাধিকবার এই অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্র ও রাজ্যের ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ এই সংঘাতকে আরও তীব্র করছে। রাজ্যের বক্তব্য, নির্বাচনের আগে বা সংবেদনশীল সময়ে কেন্দ্রীয় সংস্থার সক্রিয়তা সন্দেহজনক। কেন্দ্র অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ।
এই টানাপোড়েনের প্রভাব প্রশাসনিক স্তরেও পড়ছে। রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব তদন্ত প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। সাধারণ মানুষের কাছেও বার্তা যাচ্ছে বিভ্রান্তিকর।
ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে—এমনটাই মত পর্যবেক্ষকদের।
বেলডাঙা তদন্তে এনআইএ-র ভূমিকা ঘিরে রাজ্যের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই মামলা নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় সংস্থার ক্ষমতার সীমা এবং রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত। দেশের ফেডারেল কাঠামো রক্ষায় এই রায়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।






