দুপুর ১টা ২২ মিনিট। হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল মাটি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তি হওয়া আনুমানিক ৪.৯ মাত্রার ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দিল দুই দেশের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকায়। কম্পনের প্রভাব অনুভূত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার কিছু অংশে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায়ও কম্পন টের পাওয়া যায়। যদিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি, তবু দুপুরের ব্যস্ত সময়ে এই আকস্মিক ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়ায় জনমানসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪.৯ মাত্রার ভূমিকম্প মাঝারি স্তরের হলেও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এটি যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হতে পারে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা দীর্ঘদিন ধরেই পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
সীমান্তের কাছে ভূমিকম্প: কোথায় কতটা প্রভাব?
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছাকাছি, মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে। এই অবস্থানগত বৈশিষ্ট্যের কারণে দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় একসঙ্গে কম্পন অনুভূত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী শহরাঞ্চলে বহু মানুষ অফিস, বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। উঁচু বহুতলে থাকা বাসিন্দারা বেশি কম্পন টের পান বলে জানান।
বাংলাদেশের ঢাকা, যশোর, খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলেও কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী কম্পন অনুভূত হয়। সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে “ভূমিকম্প” ট্রেন্ড।
ভূমিকম্পের মাত্রা ৪.৯ হওয়ায় তা রিখটার স্কেলে মাঝারি শক্তির হিসেবে গণ্য হয়। তবে অগভীর গভীরতায় উৎপন্ন হলে এমন কম্পন অনেক বেশি অনুভূত হতে পারে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এটি তুলনামূলকভাবে অগভীর ভূমিকম্প ছিল।
ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট: কেন সক্রিয় এই অঞ্চল?
দক্ষিণ এশিয়া ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে সুপরিচিত। ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট ক্রমাগত উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় প্লেট ও ইন্দো-বার্মা প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত।
এই প্লেট টেকটোনিক গতিশীলতার ফলেই হিমালয় অঞ্চলে এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিয়মিত ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ ‘সিসমিক জোন’ হিসেবে চিহ্নিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটি ইন্দো-বার্মা ফল্ট লাইনের প্রভাবাধীন। অতীতে এখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প একাধিকবার হয়েছে।
যদিও ৪.৯ মাত্রার ভূমিকম্প বড় ধ্বংস ডেকে আনে না সাধারণত, তবুও এটি ভবিষ্যৎ ভূকম্পন প্রবণতার একটি সূচক হতে পারে। তাই ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলি পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ও দিন সতর্ক নজর রাখছে।
আতঙ্ক, সতর্কতা ও করণীয়: নাগরিকদের জন্য কী বার্তা?

দুপুরের ব্যস্ত সময়ে ভূমিকম্প হওয়ায় বহু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষত বহুতল আবাসনে বসবাসকারীরা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন।
প্রশাসনের তরফে সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার ও গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর না মিললেও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
ভূমিকম্পের সময় ‘ড্রপ, কভার, হোল্ড’ নীতি মেনে চলা সবচেয়ে কার্যকর। শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়া, লিফট ব্যবহার না করা এবং খোলা জায়গায় চলে যাওয়া নিরাপদ পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নগরায়নের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে ৪.৯ মাত্রার এই ভূমিকম্প বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না ঘটালেও তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল—দক্ষিণ এশিয়া ভূকম্পন-সক্রিয় অঞ্চল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন, তবে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। সচেতনতা, নিরাপদ অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সতর্কতা মিলেই কমানো যায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি।
দুপুর ১টা ২২ মিনিটের সেই কয়েক সেকেন্ড হয়তো সামান্য ছিল, কিন্তু তা আবারও বুঝিয়ে দিল—প্রকৃতির শক্তি সামনে মানুষ কতটা অসহায়। সতর্ক থাকাই একমাত্র উপায়।






