কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা বড় বাজেটের মণ্ডপ নয়। প্রতি বছরই শহরের বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তা শিল্প, ইতিহাস, সমাজ ও সমকালীন ভাবনাকে একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেন নতুন গল্প। সেই ধারাতেই এবার নজর কাড়ছে বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের ৭৩তম বর্ষের দুর্গাপুজো। এ বছরের ভাবনা—‘কোলাজ’। আর সেই ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে মণ্ডপ তৈরি হয়েছে হাজার হাজার কেজি পুনর্ব্যবহৃত সংবাদপত্র দিয়ে।
শিল্পী সোমনাথ তামলি-র ভাবনায় তৈরি এই মণ্ডপে সংবাদপত্র শুধুমাত্র নির্মাণসামগ্রী নয়, বরং হয়ে উঠেছে স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বদলে যাওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতীক। সংবাদপত্রের পাতা, অক্ষর, ছবি ও বিভিন্ন টেক্সচার একে অপরের সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে সম্পূর্ণ শিল্পকাঠামো।
‘কোলাজ’ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে এই পুজোর মূল দর্শন। আলাদা আলাদা টুকরো যখন একত্রিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করে, তখন প্রতিটি অংশের নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখেও তৈরি হয় বৃহত্তর এক সত্তা। বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের মণ্ডপ সেই ভাবনাকেই শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছে।
তবে এই ‘কোলাজ’ শুধু সংবাদপত্রের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মা দুর্গার পৌরাণিক আখ্যান, বাংলার ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংবাদপত্রের হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল যুগে যোগাযোগের পরিবর্তন। ফলে দর্শকের কাছে মণ্ডপটি শুধুমাত্র চোখের দেখার বিষয় নয়; বরং ভাবনারও একটি পরিসর তৈরি করে।
‘কোলাজ’-এর ভাবনায় সংবাদপত্রেই তৈরি সম্পূর্ণ মণ্ডপ

বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের এবারের পুজোর অন্যতম বড় আকর্ষণ হল মণ্ডপ তৈরির উপকরণ। প্রতিদিনের জীবনে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত সংবাদপত্র, যা একসময় মানুষের ঘরে ঘরে খবর পৌঁছে দিত, সেটিই এবার শিল্পের প্রধান মাধ্যম।
হাজার হাজার কেজি পুনর্ব্যবহৃত সংবাদপত্র ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে শিল্পকাঠামো। একটি একটি করে কাগজের পাতা, শব্দ, ছবি এবং নানা ধরনের ছাপ একত্রিত হয়ে তৈরি করেছে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ। ফলে দূর থেকে দেখলে যে কাঠামোটি একটি সামগ্রিক শিল্পকর্ম বলে মনে হয়, তার কাছাকাছি গেলে চোখে পড়ে অসংখ্য আলাদা আলাদা কাগজের স্তর।
এই নির্মাণপদ্ধতিই ‘কোলাজ’-এর মূল দর্শনের সঙ্গে মিশে গেছে। কোলাজে যেমন বিভিন্ন আলাদা উপাদানকে একত্রিত করে একটি নতুন অর্থ তৈরি করা হয়, তেমনই এখানে সংবাদপত্রের প্রতিটি পাতা একটি আলাদা অংশ। সেই অংশগুলি একত্রিত হয়ে তৈরি করেছে একটি বৃহত্তর দৃশ্যপট।

শিল্পী সোমনাথ তামলির পরিকল্পনায় সংবাদপত্রকে এইভাবে ব্যবহার করার মধ্যে রয়েছে নস্টালজিয়াও। একসময় সকালের চায়ের সঙ্গে হাতে সংবাদপত্র থাকা ছিল বহু পরিবারের পরিচিত দৃশ্য।
মা দুর্গার পৌরাণিক কাহিনিতেও ‘কোলাজ’-এর প্রতিচ্ছবি
‘কোলাজ’ ভাবনাটির সঙ্গে মণ্ডপ নির্মাণের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মা দুর্গার পৌরাণিক কাহিনিও। প্রচলিত পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন দেবতার সম্মিলিত ঐশ্বরিক শক্তির মাধ্যমে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। বিভিন্ন দেবতা নিজেদের শক্তি ও অস্ত্রের অংশ প্রদান করেন।

প্রচলিত বর্ণনায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র, বরুণ, বায়ু, অগ্নি, যম, কুবের ও সূর্য-সহ একাধিক দেবতার অবদানের কথা উঠে আসে। প্রত্যেকের শক্তি আলাদা, প্রত্যেকের অবদান আলাদা। কিন্তু সেই বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলিই একত্রিত হয়ে তৈরি করে মহাশক্তির পূর্ণাঙ্গ রূপ।
বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের এবারের থিমে এই ধারণাটিই ‘কোলাজ’-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, আলাদা আলাদা অংশের সমন্বয়েই তৈরি হয় সম্পূর্ণতা।
এই ব্যাখ্যায় দুর্গাপুজোর আধ্যাত্মিক ও শিল্পভাবনা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। একদিকে সংবাদপত্রের ছোট ছোট পাতা, শব্দ ও ছবি; অন্যদিকে বিভিন্ন দেবতার শক্তি—দুটি ক্ষেত্রেই আলাদা অংশের সম্মিলিত রূপান্তরই মূল বক্তব্য।
রবীন্দ্রনাথ থেকে নেতাজি—বাংলার ইতিহাসও এই ‘কোলাজ’-এর অংশ

এবারের মণ্ডপে কেবল পৌরাণিক কাহিনি নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বও জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের জীবন ও অবদানকে মণ্ডপের সামগ্রিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সত্যজিৎ রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মাতঙ্গিনী হাজরা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং স্বামী বিবেকানন্দ।
প্রত্যেকেই নিজের নিজের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের অবদান রেখে গিয়েছেন। সাহিত্য, শিক্ষা, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, সমাজসংস্কার, স্বাধীনতা সংগ্রাম কিংবা আধ্যাত্মিক চিন্তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রের এই মানুষগুলির কাজ একে অপরের থেকে আলাদা।

কিন্তু ‘কোলাজ’-এর ধারণায় সেই ভিন্নতাই হয়ে উঠেছে মূল শক্তি। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং বিভিন্ন চিন্তার মানুষের অবদানকে পাশাপাশি রেখে তৈরি হয়েছে বাংলার এবং ভারতের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের একটি বৃহত্তর ছবি।
হারিয়ে যাওয়া সংবাদপত্রের সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
এই পুজোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সংবাদপত্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া নস্টালজিয়া। মণ্ডপে এমন দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে একসময়ের সংবাদপত্র সংস্কৃতির পরিচিত ছবি দেখা যায়—বাল্কে সংবাদপত্র বোঝাই করা এবং সাইকেলে করে তা বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার দৃশ্য।
একসময় সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। ছাপাখানা থেকে সংবাদপত্র বেরনো, বান্ডিল তৈরি হওয়া, সাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পাঠকের হাতে কাগজ পৌঁছনো—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াই ছিল খবর পাওয়ার স্বাভাবিক পথ।
আজ সেই দৃশ্যের অনেকটাই বদলে গিয়েছে।
বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের মণ্ডপ সেই পরিবর্তনকেই স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছে। পুনর্ব্যবহৃত সংবাদপত্র দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করার মধ্যে তাই পরিবেশবান্ধব শিল্পচর্চার পাশাপাশি পুরনো সংবাদপাঠের সংস্কৃতিকে স্মরণ করার একটি প্রচেষ্টাও রয়েছে।
পুরনো সংবাদপত্র, যা ব্যবহার শেষে সাধারণত ফেলে দেওয়া হয় বা পুনর্ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়, সেটিই এখানে নতুন অর্থ পেয়েছে। একটি সংবাদপত্রের জীবনচক্র যেন মণ্ডপের মধ্যেই নতুনভাবে ফিরে এসেছে।
৭৩তম বর্ষে ঐতিহ্য, শিল্প ও সমকালীন ভাবনার মেলবন্ধন
বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের দুর্গাপুজো এবার ৭৩ বছরে পা দিয়েছে। দীর্ঘ এই পথচলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবারের সমকালীন শিল্পভাবনা।
ক্লাবের সম্পাদক স্নেহাশিস দেবনাথ জানিয়েছেন, ‘কোলাজ’-এর মাধ্যমে সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সমষ্টিগত স্মৃতির বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করে একটি বড় আখ্যান তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলাদা আলাদা অংশ যেমন একত্রিত হয়ে অর্থপূর্ণ কোলাজ তৈরি করে, তেমনই মা দুর্গার পৌরাণিক আখ্যানেও বিভিন্ন দেবতার শক্তি একত্রিত হয়ে একটি শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ রূপ তৈরি করে। সেই ভাবনাকেই সংবাদপত্র, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং বাংলার নানা স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ক্লাবের পক্ষ থেকে আরও তুলে ধরা হয়েছে সংবাদপত্রের ব্যবহারকে ঘিরে থাকা পরিবেশবান্ধব ভাবনা এবং হারিয়ে যেতে বসা সংবাদপাঠের সংস্কৃতির স্মৃতি। ফলে পুজোর শিল্পভাবনায় একই সঙ্গে রয়েছে অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বর্তমান সময়কে দেখার চেষ্টা।
বাগুইআটি রেল পুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের ৭৩তম বর্ষের দুর্গাপুজোর ‘কোলাজ’ তাই শুধু একটি থিম পুজো নয়। হাজার হাজার কেজি পুনর্ব্যবহৃত সংবাদপত্রকে শিল্পের ভাষায় রূপান্তর করে মণ্ডপটি একসঙ্গে তুলে ধরেছে দুর্গাপুজো, পৌরাণিক ঐতিহ্য, বাংলার ইতিহাস, সংবাদমাধ্যমের বিবর্তন, পরিবেশবান্ধব চিন্তা এবং সমষ্টিগত শক্তির ধারণা।
কাগজের আলাদা আলাদা পাতার মতোই সমাজের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি স্মৃতি এবং প্রতিটি অবদান আলাদা। কিন্তু সেগুলি যখন একত্রিত হয়, তখনই তৈরি হয় বৃহত্তর এক ছবি। ৭৩ বছরের ঐতিহ্যের মঞ্চে ‘কোলাজ’ সেই সম্মিলিত শক্তির কথাই নতুনভাবে বলছে।







