ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘বাহুবলী’ (Baahubali) নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্যের গাথা। এস এস রাজামৌলির হাত ধরে যে রাজকীয় সফরের সূচনা হয়েছিল, তা এবার রূপালী পর্দা ছাড়িয়ে প্রবেশ করেছে অ্যানিমেশনের মায়াবী জগতে। মুক্তি পেয়েছে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন সংযোজন ‘বাহুবলী: দ্য ইটারনাল ওয়ার’ (Baahubali: The Eternal War)-এর টিজার। আর প্রথম ঝলকেই এটি বিশ্বজুড়ে তৈরি করেছে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন। তবে চমকের শেষ এখানেই নয়।
অ্যানিমেশন জগতের সবথেকে বড় এবং সম্মানজনক উৎসব হিসেবে পরিচিত ‘অ্যানসি ইন্টারন্যাশনাল অ্যানিমেশন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ (Annecy International Animation Film Festival)-এ প্রদর্শনের জন্য মনোনীত হয়েছে এই ছবিটি। উৎসবের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস’ (Work In Progress) বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে ইশান শুক্লা পরিচালিত এই মহাকাব্যিক অ্যানিমেশন মুভি। যা ভারতীয় চলচ্চিত্রের মুকুটে যুক্ত করল এক নতুন পালক।
এই বিভাগটি চলচ্চিত্রের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা এর আগের ইতিহাস দেখলেই স্পষ্ট হয়। এর আগে ‘স্পাইডার-ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার-ভার্স’ (Spider-Man: Into the Spider-Verse) এবং ২০২৫ সালের অস্কারজয়ী ছবি ‘ফ্লো’ (Flow)-এর মতো বিশ্বখ্যাত অ্যানিমেশন সিনেমাগুলি এই একই বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল। ফলে, ‘বাহুবলী: দ্য ইটারনাল ওয়ার’-এর এই প্রাপ্তি শুধুমাত্র একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সাফল্য নয়, বরং পুরো ভারতীয় অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বিশ্বসেরার তালিকায় বাহুবলী: স্পাইডার-ভার্সের পথে এবার মহিষ্মতী
অ্যানসি ফেস্টিভ্যালে কোনো ভারতীয় অ্যানিমেশন ছবির এই পর্যায়ের সম্মান পাওয়া অত্যন্ত বিরল। ‘বাহুবলী: দ্য ইটারনাল ওয়ার’ টিজার মুক্তির পর থেকেই এর টেকনিক্যাল মান এবং ভিজ্যুয়াল গ্রাফিক্স নিয়ে চর্চা চলছিল। নির্মাতারা দাবি করেছেন, এই ছবির মাধ্যমে তারা ভারতীয় অ্যানিমেশনকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। ‘ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস’ বিভাগে নির্বাচনের অর্থ হলো, বিশ্বের তাবড় তাবড় অ্যানিমেশন বিশেষজ্ঞরা এই ছবির মেকিং এবং সৃজনশীলতা নিয়ে আলোচনা করবেন।
এই ফ্র্যাঞ্চাইজির মূল শক্তি হলো এর স্টোরিটেলিং এবং কাল্পনিক জগত তৈরির দক্ষতা। ‘বাহুবলী: দ্য বিগিনিং’ এবং ‘বাহুবলী: দ্য কনক্লুশন’ ভারতীয় বক্স অফিসের সমস্ত রেকর্ড চুরমার করে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল। এবার সেই একই মহিমা বজায় রেখে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে যুদ্ধের সেই পুরোনো উন্মাদনা ফিরিয়ে আনছেন নির্মাতারা। বৈশ্বিক স্তরে ভারতীয় কন্টেন্টের গ্রহণযোগ্যতা যে বাড়ছে, এই নির্বাচন তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
স্পাইডার-ভার্সের মতো হলিউড ব্লকবাস্টারের সাথে একই সারিতে বাহুবলীর নাম আসাটা সিনেমা প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত গর্বের। নির্মাতারা যেভাবে মহিষ্মতীর সাম্রাজ্যকে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে, তা ভারতীয় অ্যানিমেশন সিনেমাকে বিশ্ববাজারের এক বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইশান শুক্লার পরিচালনায় এক মহাকাব্যিক জয়যাত্রা: ২০২৭-এর অপেক্ষা
‘বাহুবলী: দ্য ইটারনাল ওয়ার’ ছবিটি দুই খণ্ডে মুক্তি পেতে চলেছে। এটি পরিচালনা করছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা ইশান শুক্লা (Ishan Shukla)। ইশান তার ইউনিক স্টোরিটেলিং স্টাইলের জন্য পরিচিত, যা বাহুবলীর মতো বড় ক্যানভাসের গল্পের জন্য একদম উপযুক্ত। ছবির প্রথম খণ্ডের টিজারটি দেখলেই বোঝা যায়, এর আবহ সঙ্গীত থেকে শুরু করে চরিত্রের ডিটেইলিং— সবক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, এই প্রজেক্টের পেছনে কাজ করছে এক বিশাল টেকনিক্যাল টিম। যারা গত কয়েক বছর ধরে দিনরাত এক করে এই অ্যানিমেশন সিরিজটি ফুটিয়ে তুলছেন। টিজারটিতে যুদ্ধের যে তীব্রতা এবং ইমোশনাল গভীরতা লক্ষ্য করা গেছে, তা দর্শকদের প্রত্যাশাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে দর্শকদের বড় পর্দার এই ম্যাজিক দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে ছবির মেকিং প্রসেস। একটি উচ্চমানের অ্যানিমেশন ফিল্ম তৈরি করতে যে ধরণের নিখুঁত ফ্রেম এবং রেন্ডারিং প্রয়োজন, তার জন্য পর্যাপ্ত সময় নিচ্ছেন নির্মাতারা। তারা চান না কোনোভাবেই বাহুবলী ব্র্যান্ডের মানের সাথে আপোষ করতে। অ্যানসি উৎসবে এই ছবির প্রদর্শনী মূলত বিশ্বকে জানান দেবে যে, ভারত এখন হাই-এন্ড অ্যানিমেশনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
ফ্রান্সের অ্যানসি উৎসব: অ্যানিমেশন জগতের অলিম্পিক আসর
ফ্রান্সের মনোরম শহর অ্যানসিতে প্রতি বছর জুন মাসের শেষ সপ্তাহে বসে এই বিশাল মেলা। এটি মূলত অ্যানিমেশন সিনেমার অলিম্পিক হিসেবে পরিচিত। ট্র্যাডিশনাল অ্যানিমেশন থেকে শুরু করে সিজিআই (CGI), স্টপ-মোশন বা ক্লে-মেশন— সমস্ত ধরণের অ্যানিমেশন ক্যালিবারকে এখানে সম্মান জানানো হয়। লেক এবং পাহাড়ের কোল ঘেঁষা এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় তখন উৎসবের মেজাজ থাকে।
উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘পাকিয়ে’ (Pâquier)-এর উন্মুক্ত আকাশের নিচে বিশাল স্ক্রিনে সিনেমা প্রদর্শন। রাত বাড়লেই পাহাড়ের ছায়ায় লেকের পাড়ে বসে হাজার হাজার মানুষ উপভোগ করেন বিশ্বের সেরা সব অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। প্রতিযোগিতার বাইরেও এখানে বিভিন্ন দেশের স্টুডিওগুলি তাদের নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করে। শনিবার সন্ধ্যায় বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
এমন এক ঐতিহ্যবাহী আসরে ভারতীয় ছবির নাম উচ্চারিত হওয়া মানে হলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের নজর কাড়া। বাহুবলীর মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি যখন এমন প্ল্যাটফর্মে জায়গা পায়, তখন তা নতুন প্রজন্মের অ্যানিমেশন শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ভারতের জন্য এটি এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
সবশেষে বলা যায়, ‘বাহুবলী: দ্য ইটারনাল ওয়ার’ শুধুমাত্র একটি অ্যানিমেশন মুভি নয়, এটি ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা। অ্যানসি উৎসবে এর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিচালনা এবং পরিকল্পনা থাকলে ভারতীয় গল্পও বিশ্বজয় করতে পারে। বাহুবলীর হাত ধরে ভারতীয় অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রি যে জোয়ারে ভাসছে, তার সুফল আগামী দিনে আরও অনেক নতুন নির্মাতাকে সাহায্য করবে। ২০২৭ সালের মুক্তির অপেক্ষায় থাকলেও, এই বিশ্ব স্বীকৃতির মাধ্যমে বাহুবলী ইতোমধ্যেই তার জয়পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে।






