পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যজুড়ে ঝোড়ো প্রচার শুরু করেছেন। বুধবার কলকাতার উপকণ্ঠে দমদমে এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে দাবি করেন যে, অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দেওয়ার কারণেই কলকাতা আজ ‘বস্তির শহর’-এ পরিণত হয়েছে।
শাহ অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার রাজনৈতিক ফায়দা এবং ভোটব্যাংকের রাজনীতির স্বার্থে সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনুপ্রবেশকারীদের কলকাতায় আশ্রয় দিচ্ছে। এর ফলে শহরের পরিকাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের নাগরিক পরিষেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। তাঁর মতে, কলকাতার যে ঐতিহ্য ও গরিমা একসময় বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল, তা আজ বাম ও তৃণমূল শাসনের জেরে ম্লান হয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। তৃণমূলের পক্ষ থেকে পালটা দাবি করা হয়েছে যে, সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব বিএসএফ তথা কেন্দ্রীয় সরকারের। ফলে অনুপ্রবেশ নিয়ে অভিযোগ তোলা আসলে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা মাত্র। তবে অমিত শাহের এই আক্রমণ যে আগামী নির্বাচনে বিজেপির অন্যতম প্রধান অস্ত্র হতে চলেছে, তা স্পষ্ট।
অনুপ্রবেশ ও ভোটব্যাংকের রাজনীতি: শাহের মূল নিশানা
দমদমের সভা থেকে অমিত শাহ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে বলেন, “মমতা দিদি কলকাতাকে অনুপ্রবেশকারীদের অভয়ারণ্য বানিয়ে ফেলেছেন। নিজের ভোটব্যাংক অটুট রাখতে তিনি সীমান্ত দিয়ে আসা লোকেদের বস্তিগুলোতে পুনর্বাসন দিচ্ছেন। এর ফলে কলকাতার কর্মসংস্থান আজ সঙ্কটে।” তিনি আরও দাবি করেন যে, অনুপ্রবেশকারীরা বাংলার যুবকদের চাকরির সুযোগ ছিনিয়ে নিচ্ছে এবং দেশের সুরক্ষার জন্য বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শাহের মতে, অনুপ্রবেশ কেবল জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনই আনছে না, বরং এটি রাজ্যের অর্থনৈতিক বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, যদি রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হবে এবং অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে।
শিল্পায়ন ও কলকাতার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি
কলকাতার বর্তমান দশার জন্য ‘কাট-মানি’ এবং ‘সিন্ডিকেট রাজ’কে দায়ী করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, একসময় ভারতের জিডিপিতে বাংলার অবদান ছিল ২০ শতাংশ, যা আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। শাহের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিজেপি সরকার গড়লে কলকাতায় চারটি নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউনশিপ তৈরি করা হবে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া ৭,০০০ কলকারখানা পুনরায় চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও যোগ করেন যে, মোদী সরকারের অধীনে কলকাতা মেট্রোর পরিধি তিনগুণ বাড়ানো হবে। “তিলোত্তমা”কে পুনরায় একটি আধুনিক ও বিশ্বমানের শহরে রূপান্তরিত করাই বিজেপির লক্ষ্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালকে ‘অন্ধকারের যুগ’ বলে বর্ণনা করে তিনি সাধারণ মানুষকে পরিবর্তনের ডাক দেন।
নারী সুরক্ষা ও সন্দেশখালি ইস্যু: শাহের আক্রমণাত্মক মেজাজ
বক্তৃতার এক পর্যায়ে শাহ সন্দেশখালি এবং আরজি কর হাসপাতালের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “মমতা দিদি নিজে একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যে মহিলারা সুরক্ষিত নন। অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।” শাহ হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ৪ঠা মে গণনার পর বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে প্রত্যেক অপরাধীকে ‘উল্টো করে ঝুলিয়ে সোজা করা হবে’।

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত বা পিএম আবাস যোজনার মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো রাজ্যে কার্যকর করতে দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে গরিব মানুষ প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শাহের দাবি, বিজেপি এলে রাজ্যে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা হবে এবং ঋষি অরবিন্দ ও রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে উঠবে।
অমিত শাহের এই সফর এবং বিশেষ করে কলকাতাকে ‘বস্তির শহর’ বলে অভিহিত করা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে যখন বিজেপি হিন্দুত্ব এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুকে হাতিয়ার করে এগোচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব দিয়ে পালটা লড়াই দিচ্ছে। তবে শাহের এই কঠোর অবস্থান এবং উন্নয়ন ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি বাংলার সাধারণ ভোটারের মনে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ২০২৬-এর লড়াই যে মূলত অনুপ্রবেশ ও সুশাসনের ইস্যুতেই লড়া হবে, শাহের ভাষণ তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গেল।






