মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির পর ভারতীয় চামড়া শিল্পে ফিরছে আত্মবিশ্বাস। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, অর্ডার কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক বাজারের টানাপোড়েনে যে শিল্পটি কার্যত ধুঁকছিল, সেখানে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত স্পষ্ট। বিশেষ করে রপ্তানি নির্ভর ইউনিটগুলিতে আবারও আলোচনায় এসেছে কর্মী পুনর্নিয়োগ।
গত দু’বছরে বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ কাঁচামালের দাম এবং মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে বহু ট্যানারি ও প্রস্তুতকারক সংস্থা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমবাজারে—হাজার হাজার দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী কাজ হারান।
তবে মার্কিন চুক্তির পর নতুন করে রপ্তানি অর্ডার আসার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় শিল্পমহলে আশার সঞ্চার হয়েছে। শিল্প সংগঠনগুলির দাবি, এই চুক্তি কার্যকর হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই উৎপাদন বাড়বে এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত মানবসম্পদের।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন একটাই—চামড়া শিল্প কি সত্যিই হারানো কর্মসংস্থান ফেরাতে পারবে? নাকি এটি শুধুই সাময়িক স্বস্তি?
মার্কিন চুক্তি কীভাবে বদলাচ্ছে চামড়া শিল্পের রপ্তানি মানচিত্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক। নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক সংক্রান্ত বাধা ও কিছু নন-ট্যারিফ ইস্যু সহজ হওয়ায় ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত হচ্ছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির ফলে জুতো, ব্যাগ, গ্লাভস ও গার্মেন্ট লেদার পণ্যের অর্ডার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বিশেষ করে মিড-সেগমেন্ট ও প্রিমিয়াম ক্যাটাগরিতে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
রপ্তানি বাড়লে উৎপাদন চক্র স্বাভাবিকভাবেই গতি পাবে। দীর্ঘদিন ধরে যে কারখানাগুলি আংশিক ক্ষমতায় চলছিল, সেগুলি আবার ফুল ক্যাপাসিটিতে ফেরার পরিকল্পনা করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে।
তবে শিল্পপতিরা এটাও মানছেন যে শুধু চুক্তিই যথেষ্ট নয়। সময়মতো ডেলিভারি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলাই হবে ভবিষ্যতের আসল চ্যালেঞ্জ।
ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের ফেরানোর প্রস্তুতি: কতটা বাস্তবসম্মত?

অনিশ্চিত সময়কালে বহু কারখানা খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই করেছিল। সেই কর্মীদের অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন অথবা অস্থায়ী কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এখন পুনর্নিয়োগের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—দক্ষ শ্রমিকদের আবার ফিরিয়ে আনা।
শিল্প সংগঠনগুলির দাবি, প্রাথমিকভাবে অস্থায়ী ও কন্ট্রাক্ট বেসিসে নিয়োগ শুরু হতে পারে। অর্ডার স্থায়ী হলে ধীরে ধীরে স্থায়ী পদও ফিরবে। বিশেষ করে দক্ষ কাটিং মাস্টার, ফিনিশিং স্পেশালিস্ট ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল কর্মীদের চাহিদা বাড়বে।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলির একাংশ সতর্ক। তাদের মতে, পুনর্নিয়োগের নামে যদি কম মজুরি বা অনিশ্চিত চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হবে না। শিল্পের পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক সুরক্ষাও সমান জরুরি।
এই অবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—স্কিল আপগ্রেডেশন, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এই সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: সুযোগের পাশাপাশি সতর্কবার্তা

মার্কিন চুক্তি চামড়া শিল্পকে নতুন দিশা দেখালেও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি মসৃণ নয়। পরিবেশগত মান, ESG কমপ্লায়েন্স এবং ট্রেসেবিলিটি এখন বৈশ্বিক বাজারের মূল শর্ত। এগুলি পূরণে ব্যর্থ হলে অর্ডার টেকসই হবে না।
এছাড়াও প্রতিযোগিতা বাড়ছে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে। সেখানে কম খরচে উৎপাদন এবং দ্রুত লজিস্টিক সুবিধা ভারতীয় শিল্পের জন্য চাপ তৈরি করছে।
তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি প্রযুক্তি আপগ্রেডেশন, সবুজ উৎপাদন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে ভারতীয় চামড়া শিল্প আবারও বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। আর সেই পথেই ফিরতে পারে হারানো কর্মসংস্থান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিঃসন্দেহে ভারতীয় চামড়া শিল্পের জন্য একটি বড় সুযোগ। রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান ফেরানোর আশাও জোরালো হয়েছে। তবে এই পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে শিল্পের দূরদৃষ্টি, শ্রমিক সুরক্ষা এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার উপর। সুযোগ এসেছে—এবার তা কাজে লাগানোর পালা।






