প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী তথা জনপ্রিয় গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেফতার ঘিরে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে। বুধবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের পর সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরোতেই তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম আলোচিত আর্থিক অনিয়মের মামলায় এই পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে তদন্তকারী মহল।
ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বিক্রি হওয়া বিশেষ পাস ও টিকিটকে ঘিরে। তদন্তকারীদের দাবি, ইউনেস্কোর নাম ও পরিচিতি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ প্রবেশাধিকারের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
তদন্তে একাধিকবার হাজিরা এড়ানো, আর্থিক লেনদেনের অসঙ্গতি এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নথি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের গতি বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেফতারির ঘটনায় মামলাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ, সকলের মধ্যেই এখন প্রশ্ন একটাই, ঠিক কী কী অভিযোগ রয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে? চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর পাস বিক্রির অভিযোগ
তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের দুর্গাপুজো উপলক্ষে বিশেষ পাস ও প্রিভিউ এন্ট্রি টিকিট বিক্রি করা হয়। প্রচারে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কলকাতার দুর্গাপুজো দেখার বিশেষ সুযোগ মিলবে এই পাসের মাধ্যমে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১,৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ১২,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যের টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়, এই টিকিট ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে বা নির্দিষ্ট উপায়ে কিছু বিখ্যাত পুজোমণ্ডপে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করার বৈধ অনুমতি আদৌ ছিল কি না। এই অভিযোগই বর্তমানে মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
আর্থিক অনিয়ম ও কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন
শুধু পাস বিক্রি নয়, এই মামলায় বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, পাস বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংগৃহীত অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। সেই কারণেই একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, আর্থিক নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপ তদন্তের আওতায় এসেছে।
ইডির তদন্তে কিছু আর্থিক লেনদেন নিয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর এবং সেই অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে অসহযোগিতা ও আইনি চাপ বৃদ্ধি
তদন্তকারীদের দাবি, ইন্দ্রনীল সেনকে একাধিকবার তলব করা হলেও সব ক্ষেত্রেই তিনি সহযোগিতা করেননি। লালবাজারে হাজিরা সংক্রান্ত বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানা গেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়।
মামলায় গ্রেফতারি এড়াতে তিনি আগাম জামিনের আবেদন করেছিলেন। তবে কলকাতা হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। পরে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ালেও তাৎক্ষণিক স্বস্তি মেলেনি।
পরিস্থিতির মধ্যেই ইডির জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ গ্রেফতার করে। এরপর তাঁকে লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয় বলে জানা গেছে।
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বড়সড় চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর পাস বিক্রি, আর্থিক অনিয়ম, তদন্তে অসহযোগিতা এবং কোটি টাকার লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগ এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে আইনের চোখে অভিযুক্ত হিসেবেই গণ্য করা হবে। তদন্ত যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হবে এই বহুচর্চিত মামলার প্রকৃত চিত্র।






