শারদীয়ার অপেক্ষা এবার আরও দীর্ঘ হতে চলেছে। ২০২৬ সালে দুর্গাপুজোর মূল পর্ব শুরু হবে ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী দিয়ে এবং শেষ হবে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে। তার আগে ১০ অক্টোবর পালিত হবে মহালয়া, অর্থাৎ দেবীপক্ষের সূচনা।
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সপ্তমী তিথির বিস্তার। সপ্তমীর সূর্যোদয় দু’দিন স্পর্শ করায় ১৭ এবং ১৮ অক্টোবর—দু’দিনই সপ্তমীর আবহ থাকবে। এরপর ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী।
ফলে পঞ্জিকা অনুযায়ী শারদীয়ার মূল উৎসব এবার কার্যত ছয় দিনের ক্যালেন্ডারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে ষষ্ঠীর বোধন থেকে দশমীর বিসর্জন পর্যন্ত চলবে নানা আচার, অঞ্জলি, আরতি, সন্ধিপুজো, ধুনুচি নাচ ও সিঁদুর খেলা।
তবে মনে রাখা দরকার, তিথি এবং নির্দিষ্ট পুজোর মুহূর্ত এক বিষয় নয়। পুজো কমিটি, পারিবারিক পুজো ও স্থানীয় পঞ্জিকা অনুসারে অঞ্জলি, আরতি বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের ঘড়ির সময় আলাদা হতে পারে।
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর সম্পূর্ণ দিন-তারিখ
- মহালয়া — ১০ অক্টোবর, শনিবার: দেবীপক্ষের সূচনা ও তর্পণ।
- মহাপঞ্চমী — ১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার: পুজোর প্রস্তুতি ও উৎসবের আবহ আরও ঘন হবে।
- মহাষষ্ঠী — ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার: কল্পারম্ভ, দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস।
- মহাসপ্তমী — ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, শনিবার ও রবিবার: নবপত্রিকা সংক্রান্ত আচার ও সপ্তমীর পুজো।
- মহাষ্টমী — ১৯ অক্টোবর, সোমবার: অষ্টমীর পুজো, পুষ্পাঞ্জলি, কুমারীপুজো এবং সন্ধিপুজো।
- মহানবমী — ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার: নবমীর পুজো, হোম-যজ্ঞ ও ভোগ-আরতি।
- বিজয়া দশমী — ২১ অক্টোবর, বুধবার: দশমীর পুজো, সিঁদুর খেলা এবং দেবীর বিসর্জন।
এই তারিখগুলির সঙ্গে কলকাতা-কেন্দ্রিক পঞ্জিকা ও বিভিন্ন প্রকাশিত পুজো-সূচির মিল রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের SAHAJ পোর্টালেও ১০ অক্টোবর মহালয়া এবং ১৭–২১ অক্টোবর ষষ্ঠী থেকে দশমীর সূচি প্রকাশ করা হয়েছে; বিভিন্ন পঞ্জিকায় সপ্তমীর তারিখের উপস্থাপনায় পার্থক্য দেখা যায়।
মহাষষ্ঠী থেকে সপ্তমী: বোধন ও নবপত্রিকার আচার

১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী। এই দিন থেকেই মূল দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে পুজোমণ্ডপে আহ্বান করা হয়। কলকাতার বহু বারোয়ারি ও বনেদি বাড়ির পুজোয় ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকেই উৎসবের আনুষ্ঠানিক আবহ তৈরি হয়।
এর পরের দিন ১৭ অক্টোবর সপ্তমী। তবে ২০২৬ সালের তিথি-বিন্যাসে সপ্তমী পরের দিনও সূর্যোদয় স্পর্শ করছে। তাই ১৮ অক্টোবরও সপ্তমীর তিথি থাকবে। বিভিন্ন পঞ্জিকায় এই কারণে সপ্তমীর উপস্থাপনায় কিছুটা পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
সপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার হল নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্নান। বাংলায় যা অনেকের কাছে ‘কলা বউ’ নামে পরিচিত, তা দুর্গাপুজোর লোকাচার ও শাস্ত্রীয় রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরপর দেবীর সপ্তমীর পুজো, অঞ্জলি, ভোগ ও সন্ধ্যার আরতি হয়।
মহাষ্টমী, সন্ধিপুজো ও মহানবমীর নির্ঘণ্ট

মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো ও দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যবাহী আচার
১৯ অক্টোবর, সোমবার মহাষ্টমী। অষ্টমীর সকালে পুষ্পাঞ্জলি দিতে ভিড় জমে মণ্ডপে। অনেক পুজোয় এই দিন কুমারীপুজো, বিশেষ ভোগ এবং অন্যান্য আচারও অনুষ্ঠিত হয়।
অষ্টমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির একটি হল সন্ধিপুজো। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে এই বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়। একটি প্রচলিত কলকাতা-কেন্দ্রিক পঞ্জিকা অনুযায়ী ২০২৬ সালে সন্ধিপুজোর সময় সকাল ৭টা ২৬ মিনিট থেকে ৮টা ১৪ মিনিটের মধ্যে ধরা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট পঞ্জিকা অনুসারে সময় যাচাই করা জরুরি।
অষ্টমীর সন্ধ্যায় বহু মণ্ডপে ধুনুচি নাচ ও বিশেষ আরতি হয়। শহরের বড় পুজোগুলিতে এই সময় দর্শনার্থীর ভিড়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
এর পর ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার মহানবমী। নবমীর পুজোর পাশাপাশি হোম-যজ্ঞ, পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ ও আরতি হয়। অনেক বাড়ি ও বারোয়ারি পুজোয় নবমীর হোম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়।
বিজয়া দশমী ২০২৬: সিঁদুর খেলা থেকে বিসর্জন

বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা, দেবীবরণ ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদোৎসব।
বিজয়া দশমীতে কলকাতায় দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জন ও সিঁদুর খেলার দৃশ্য
২১ অক্টোবর, বুধবার বিজয়া দশমী। সকালে দশমীর পুজো ও দেবীবরণের পর শুরু হয় বিদায়ের প্রস্তুতি। বহু মণ্ডপে মহিলারা সিঁদুর খেলায় অংশ নেন এবং পরস্পরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান।
এরপর নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রশাসনিক সময়সূচি মেনে শুরু হয় দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জন। কলকাতার বিভিন্ন ঘাটে একের পর এক প্রতিমা পৌঁছয় শোভাযাত্রায়। ঢাকের বাদ্যি, উলুধ্বনি এবং ‘আসছে বছর আবার হবে’—এই আবেগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুর্গোৎসব।
বিসর্জনের নির্দিষ্ট সময় অবশ্য পুজো কমিটি ও প্রশাসনের অনুমোদিত সূচি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। তাই দর্শনার্থীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির ঘোষণা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশিকা অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ দুর্গাপুজো: এক নজরে সম্পূর্ণ নির্ঘণ্ট
| দিন | তারিখ | প্রধান আচার |
|---|---|---|
| মহালয়া | ১০ অক্টোবর, শনিবার | তর্পণ, দেবীপক্ষের সূচনা |
| মহাপঞ্চমী | ১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার | পুজোর প্রস্তুতি |
| মহাষষ্ঠী | ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার | বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস |
| মহাসপ্তমী | ১৭ অক্টোবর, শনিবার | সপ্তমীর পুজো |
| সপ্তমীর দ্বিতীয় দিন | ১৮ অক্টোবর, রবিবার | নবপত্রিকা ও সপ্তমীর আচার |
| মহাষ্টমী | ১৯ অক্টোবর, সোমবার | অঞ্জলি, কুমারীপুজো, সন্ধিপুজো |
| মহানবমী | ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার | নবমী পুজো, হোম |
| বিজয়া দশমী | ২১ অক্টোবর, বুধবার | সিঁদুর খেলা, বিসর্জন |
২০২৬ সালের দুর্গাপুজো বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে বিশেষ জায়গা করে নিতে চলেছে। ১০ অক্টোবর মহালয়া দিয়ে শুরু হওয়া শারদীয়ার আবহ ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীর বোধনে নতুন মাত্রা পাবে। সপ্তমীর তিথি দু’দিন থাকায় উৎসবের মাঝের পর্বও এবার আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
১৯ অক্টোবর অষ্টমীর অঞ্জলি ও সন্ধিপুজো, ২০ অক্টোবর নবমীর আচার এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদোৎসব। প্যান্ডেল হপিং, পুজোর অঞ্জলি কিংবা পরিবারের সঙ্গে উৎসবের পরিকল্পনা—সবকিছুর জন্য এই দুর্গাপুজো সময় নির্ঘণ্ট ২০২৬ একটি দ্রুত রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
নোট: পুজোর নির্দিষ্ট মুহূর্ত ও আচার পালনের সময় পঞ্জিকা, স্থান ও পুজোর রীতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে সন্ধিপুজো, নবপত্রিকা স্নান, অঞ্জলি ও বিসর্জনের সময় স্থানীয় পুজো কমিটির ঘোষণা অনুসরণ করা উচিত।






