কলকাতার রাজনৈতিক মহলে গত কয়েকদিন ধরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হল কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের সম্ভাবনা। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক মুখ হিসেবে পরিচিত ‘ববি’ হাকিমকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই জল্পনা শুধু কলকাতা নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণেও নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
দলীয় সূত্র এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কলকাতা পুরসভার উপর নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একাধিক জটিলতার কারণে ফিরহাদ হাকিম নিজেকে ‘সাফোকেটেড’ বা ‘দমবন্ধ’ অবস্থায় অনুভব করছেন। সেই কারণেই তিনি মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনও বিবৃতি এখনও সামনে আসেনি, তবুও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদত্যাগ শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা।
ফিরহাদ হাকিম ২০১৮ সাল থেকে কলকাতার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নেতৃত্বে একাধিক নগর উন্নয়ন প্রকল্প, পরিকাঠামো উন্নয়ন, জল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নাগরিক পরিষেবা আধুনিকীকরণের কাজ হয়েছে। ফলে তাঁর সম্ভাব্য পদত্যাগ স্বাভাবিকভাবেই কলকাতার প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
কেন তৈরি হল পদত্যাগের জল্পনা?
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে চাপ এবং মতবিরোধের খবর সামনে এসেছে। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, কলকাতা পুরসভার একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মেয়রের অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। এমনকি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁর অজান্তে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর পুর প্রশাসন পরিচালনায় নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কিছু তৃণমূল নেতা দাবি করেছেন যে প্রশাসনিক স্বাধীনতা আগের মতো নেই এবং সেই পরিস্থিতি থেকেই তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষও জানিয়েছেন যে ফিরহাদ হাকিম দীর্ঘদিন ধরেই পদত্যাগের অনুমতি চাইছিলেন। শেষ পর্যন্ত দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেছেন বলেও খবর প্রকাশ্যে এসেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ফিরহাদ হাকিম?
ফিরহাদ হাকিম শুধুমাত্র কলকাতার মেয়র নন, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যালঘু মুখ এবং দীর্ঘদিনের সংগঠক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৮ সালে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের পর কলকাতার মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এরপর থেকে কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শহরের পরিচ্ছন্নতা, নাগরিক পরিষেবা, রাস্তা সংস্কার এবং উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্পে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর পদত্যাগ তৃণমূলের কাছে শুধু একটি প্রশাসনিক ক্ষতি নয়, বরং সাংগঠনিকভাবেও একটি বড় ধাক্কা হতে পারে। বিশেষ করে কলকাতা পুরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের পরিবর্তন দলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে কারা থাকতে পারেন?
ফিরহাদ হাকিমের সম্ভাব্য পদত্যাগের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন? যদিও এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবে তৃণমূলের অভ্যন্তরে কয়েকজন অভিজ্ঞ কাউন্সিলর ও নেতার নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দল আগামী পুর নির্বাচন এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে এমন একজন নেতাকে সামনে আনতে চাইবে যিনি একইসঙ্গে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।
অন্যদিকে বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেছে। ফলে মেয়র পদে পরিবর্তন হলে তার রাজনৈতিক অভিঘাতও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ফিরহাদ হাকিমের সম্ভাব্য পদত্যাগ ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘দমবন্ধ’ অবস্থার কথা সামনে আসার পর থেকেই জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি, তবুও এটা স্পষ্ট যে কলকাতা পুরসভার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
আগামী কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহই নির্ধারণ করবে ফিরহাদ হাকিমের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং কলকাতার প্রশাসনিক নেতৃত্ব কোন পথে এগোবে।






