কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ-এ বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হল রিডিং রুমের ফলস্ সিলিং ভেঙে পড়ার ঘটনায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ছাত্রছাত্রী, চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরেই ভবনের একাধিক অংশে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ছিল, কিন্তু সেই বিষয়ে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সূত্রের খবর, ঘটনাটি ঘটে কলেজের একটি রিডিং রুমে, যেখানে সেই সময় পড়াশোনা করছিলেন বেশ কয়েকজন মেডিক্যাল পড়ুয়া। আচমকাই সিলিংয়ের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। পড়ুয়ারা দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ভাঙা সিলিংয়ের সঙ্গে প্লাস্টার, ধুলো এবং কিছু বৈদ্যুতিক অংশও নিচে পড়ে যায়। ঘটনায় কয়েকজন সামান্য আহত হন বলে খবর। যদিও কর্তৃপক্ষের তরফে গুরুতর আঘাতের কোনও সরকারি নিশ্চিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
এই ঘটনার পর ফের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলির পরিকাঠামো নিয়ে। চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কেন বারবার অভিযোগ উঠছে, তা নিয়েও সরব বিভিন্ন মহল। ছাত্র সংগঠনগুলিও দ্রুত তদন্ত ও সংস্কারের দাবি তুলেছে।
রিডিং রুমে আচমকা ভেঙে পড়ল ফলস্ সিলিং, আতঙ্কে পড়ুয়ারা
ঘটনার সময় রিডিং রুমে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে বিকট শব্দ শুনতে পান। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সিলিংয়ের একটি অংশ নিচে ভেঙে পড়ে। হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায় রুমের ভিতরে। আতঙ্কিত পড়ুয়ারা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন।
পড়ুয়াদের একাংশের অভিযোগ, বেশ কয়েকদিন ধরেই সিলিং থেকে ধুলো পড়ছিল এবং কিছু অংশ ফেটে যাওয়ার চিহ্নও দেখা যাচ্ছিল। সেই বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও দ্রুত কোনও মেরামতির কাজ হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
ঘটনার পর কলেজ চত্বরে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়। বহু পড়ুয়া নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, মেডিক্যাল পড়াশোনার চাপের মধ্যেই যদি পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে কলেজ প্রশাসন। পরে প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের একটি দল এসে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরীক্ষা করে বলে জানা গিয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগেও সাময়িক সমস্যা দেখা দেয় বলে সূত্রের খবর।
পুরনো পরিকাঠামো নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি ছাত্রদের
এই ঘটনার পর ফের সামনে এসেছে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির পুরনো ভবন ও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের একাধিক অংশ বহু পুরনো হওয়ায় নিয়মিত মেরামত ও পরিদর্শনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, শুধু এই একটি রুম নয়, কলেজের আরও বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। কোথাও জল চুঁইয়ে পড়ছে, কোথাও দেওয়ালে ফাটল দেখা যাচ্ছে। বারবার অভিযোগ জানানোর পরেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি বলে দাবি তাঁদের।
চিকিৎসক মহলের একাংশও মনে করছেন, স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকে আক্রমণ করেছে। তাঁদের দাবি, সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি বহুদিন ধরেই উঠছে, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সংস্কারের আশ্বাস কলেজ কর্তৃপক্ষের
ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ জরুরি বৈঠক করে বলে জানা গিয়েছে। প্রশাসনের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত করা হবে এবং গোটা ভবনের নিরাপত্তা পর্যালোচনা করা হবে।
কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, আপাতত ওই রিডিং রুমটি বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্য রুমে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। একই সঙ্গে পুরো ভবনের ফলস্ সিলিং, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং কাঠামোগত অবস্থা খতিয়ে দেখা হবে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র দুর্ঘটনার পরে সংস্কার নয়, বরং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ কলকাতার বহু সরকারি ভবন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বহু পুরনো। ফলে নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং দ্রুত সংস্কারের দাবি আরও জোরালো হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের রিডিং রুমে ফলস্ সিলিং ভেঙে পড়ার ঘটনা অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেও, এটি সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত, সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং পুরনো সরকারি ভবনের বাস্তব চিত্রও সামনে এনে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রশাসন কত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর সকলের।






